Showing posts with label গল্প. Show all posts
Showing posts with label গল্প. Show all posts

Sunday, August 19, 2012

আইজ্যাক আসিমভের ছোটগল্প – Rain, Rain, Go away

Leave a Comment
“ওকে আবারও দেখা যাচ্ছে,” জানালার
পর্দা আলতোভাবে সরিয়ে লিলিয়ান রাইট
বলল, “ঐযে ওখানে ও, জর্জ।”
“ঐখানে কে আছে বলছ?” টেলিভিশনে বেসবল
খেলা দেখার জন্য সন্তোষজনক একটা চ্যানেল
খুঁজতে খুঁজতে জানতে চাইল লিলিয়ানের স্বামী।
“মিসেস স্যাকারো,” লিলিয়ান বলল,
“কে মিসেস স্যাকারো?” ওর
স্বামী অনিবার্যভাবেই এ
প্রশ্নটা করবে এমন আভাস পেয়েই দ্রুত
আরো যোগ করল, “ভালো কথা, আমাদের নতুন প্রতিবেশী।”
“ওহ।”
“সূর্যস্নান করছে। সব সময় সূর্যস্নান করে।
আমি অবাক হচ্ছি, কোথায় ওর ছেলেটা। ও
সাধারণত এমন চমৎকার
একটা দিনে বাইরে বের হয়, ওদের ঐ অদ্ভুত সুন্দর উঠোনে দাঁড়িয়ে ঘরের দেয়ালে বল
ছুঁড়ে মারে। তুমি ওকে কখনো দেখেছিলে,
জর্জ?”
“আমি ওর কথা শুনেছি। চাইনিজ জল যন্ত্রণার
একটা সংস্করণ এটা। দেয়ালে প্রচণ্ড
শব্দে আঘাত করা, মাটিতে দাপাদাপি করা, হাততালি দেওয়া। প্রচণ্ড আঘাত, দাপাদাপি,
হাততালি, প্রচণ্ড আঘাত, দাপাদাপি…”
“ও ভালো ছেলে, শান্ত, সুন্দর ব্যবহার। আমার
ইচ্ছে, টমি ওর সাথে বন্ধুত্ব করুক। ও টমির
সমবয়সী হবে, বয়স দশের কাছাকাছি।”
“আমি জানতাম না, টমি ওর সাথে বন্ধুত্ব করতে চায় না।”
“অবশ্য, স্যাকারোদের সাথে বন্ধুত্ব
করতে যাওয়াটা কঠিন।
ওরা নিজেদেরকে নিয়েই আছে। এমনকি আমিও
জানিনা স্যাকারো সাহেব কি করে।”
“তুমি কেন জানবে? সে কি করে, এটা জানা সত্যিই কারো কাজ নয়।”
“আমার কাছে অদ্ভুত লাগে,
কখনো তাঁকে কাজে যেতে দেখিনি।”
“আমাকেও কেউ কখনো কাজে যেতে দেখেনি।”
“তুমি বাড়িতে বসে লেখালেখি কর।
সে কি করে?” “আমি নিশ্চিত, মিসেস স্যাকারো জানে উনার
স্বামী কি করে, আর সেও তোমার মত অস্থির
হয়ে আছে কারন সে জানে না আমি কি করি।”
“ওহ, জর্জ,” লিলিয়ান জানালা থেকে চোখ
সরিয়ে বিরক্তি নিয়ে টেলিভিশনের
দিকে তাঁকাল, “আমার মনে হয়, প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ক গড়তে আমাদের একটা উদ্যোগ
নেওয়া উচিত।”
“কি ধরণের উদ্যোগ?” জর্জ সোফায় আরাম
করে বসে, মাত্রই খোলা হয়েছে জমাট হিম
কণায় আদ্র এমন একটা রাজকীয় আকারের
সোডা হাতে নিল। “ওদের সাথে পরিচিত হওয়া।”
“বেশ, তুমি চাওনি, যখন মিসেস
স্যাকারো বের হয়েছিল?
তুমি বললে তুমি ডেকেছিলে।”
“আমি হ্যালো বলেছিলাম, ঠিক আছে, ও একটু
বেরিয়ে আসল, সাংসারিক কাজে ওকে তখনো বিচলিত দেখাচ্ছিল, তাই
শুধু মাত্র হ্যালো, এই পর্যন্তই। দুই মাস
হতে চলল, মাঝে মধ্যে হ্যালো বলা ছাড়া এখন
পর্যন্ত আর বেশি কিছু হয় নি।… ও খুব অদ্ভুত
মেয়ে।”
“অদ্ভুত মেয়ে?” “ও সব সময় আকাশের দিকে তাঁকিয়ে থাকে।
শত শত বার ওকে আমি এমন করতে দেখেছি।
সামান্য মেঘ করলেও ও কখনো বাইরে বের
হয়না। একদিন, ওর ছেলেটা বাইরে খেলছিল,
ওকে ভিতরে আসার জন্য ডাকাডাকি করল,
চেঁচিয়ে বলল বৃষ্টি শুরু হতে যাচ্ছে। আমি ওকে বলতে শুনলাম। ভাবলাম,
বৃষ্টিতে হয়ত আমিও ভিজে যাবো, তাই দ্রুত
সরে এলাম। অবশ্য, বেশ সূর্যের আলো ছিল। ওহ,
সামান্য কিছু মেঘ ছিল, এর বেশি কিছু নয়,
সত্যি বলছি।”
“শেষ পর্যন্ত, বৃষ্টি হয়েছিল?” “মোটেই না। উঠোন থেকে আমি শুধু শুধু
দৌড়ে এলাম।”
জর্জ কয়েকটা বেস হিটের
মাঝে হারিয়ে গেল। বল প্রায়
হতবুদ্ধি করে বেরিয়ে গেল, এর মানে এক
রান। যখন উত্তেজনা শেষ হয়ে এল এবং বল নিক্ষেপকারী তাঁর হাতে বলটি আবার
ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছিল, লিলিয়ান
ততক্ষণে রান্নাঘরের দিকে অদৃশ্য
হয়ে গেছে। জর্জ ওর উদ্দেশ্যে বলে উঠল,
“বেশ, যেহুতু
তাঁরা অ্যারিজোনা থেকে এসেছে, আমি নিশ্চিত, মেঘ-বৃষ্টি এই সব জিনিসের
সাথে তাঁরা পরিচিত নন।”
লিলিয়ান দ্রুতপায়ে শোবার ঘরে ফিরে এল,
“কোথা থেকে এসেছে?”
“টমির কথা অনুযায়ী অ্যারিজোনা থেকে।”
“টমি কিভাবে জানল?” “আমার ধারণা, বল খেলার সময়
টমি ছেলেটার সাথে কথা বলেছে। ও
টমিকে বলেছে ওরা অ্যারিজোনা থেকে এসেছে।
এরপর ওকে ভিতরে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়।
টমি বলেছে এটা অ্যারিজোনা অথবা অ্যালাবামার
মত কোন একটা জায়গা হবে। তুমিতো টমিকে জানো, পুরোপুরি কিছু
মনে করতে পারে না ও। কিন্তু
যদি তাঁরা আবহাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে,
তবে আমার মনে হয়, অ্যারিজোনাই হবে।
আমাদের এত সুন্দর বৃষ্টিভাবাপন্ন
জলবায়ুকে কি করে বুঝতে হবে, তাঁরা তা জানে না।”
“কিন্তু তুমি আমাকে আগে কখনো বলনি কেন?”
“কারন টমি আমাকে আজ সকালে বলেছে মাত্র,
আমি ভেবেছিলাম তোমাকে ও
ইতোমধ্যে অবশ্যই বলে থাকবে। আর
সত্যি বলতে কি, আমি ভেবেছিলাম তুমি তাঁদের একটা স্বাভাবিক অস্তিত্ব বের
করে আনতে পেরেছ, যদিও তুমি কখনই কিছু
খুঁজে পাওনি। ওয়াও…”
বল উড়ে গিয়ে রাইটফিল্ড স্ট্যান্ডে পরল,
এবং সেখান থেকে বল
কুড়িয়ে এনে নিক্ষেপকারীর কাছে পাঠান হল।
লিলিয়ান জানালার পর্দার
কাছে ফিরে গিয়ে বলল, “আমি শুধু ওর
সাথে পরিচিত হতে চাই। ও দেখতে কত
চমৎকার। …ওহ, জর্জ এদিকে দেখ।”
জর্জ টিভি বাদ দিয়ে আর কোথাও তাঁকাল না। লিলিয়ান বলল, “আমি জানি, ও ঐ মেঘের
দিকে একদৃষ্টিতে তাঁকিয়ে আছে। আর এখন ও
ভিতরে চলে যাবে। বিশ্বাস কর।”
****
লাইব্রেরিতে রেফারেন্স খুঁজতে গিয়ে জর্জ
দুই দিন বাইরে ছিল, ফিরল এক গাদা বই সাথে নিয়ে। লিলিয়ান
উৎফুল্লভাবে তাকে স্বাগত জানিয়ে বলল,
“এখুনি, আগামীকাল তুমি আর কোন কাজ করছ
না।”
“তোমার কথাটা বিবৃতির মত শোনাচ্ছে, প্রশ্ন
নয়।” “বিবৃতিই বলতে পাড়। আমরা স্যাকারোদের
সাথে মর্ফি’স পার্কে যাচ্ছি।”
“সাথে…”
“পাশের বাড়ির পতিবেশীর সাথে, জর্জ।
তুমি নামটি কখনই মনে রাখতে পারনা কেমন
করে?” “বেশ উপহার দিলে। কিভাবে এটা সম্ভব
হল?”
“আজ ঠিক সকালে ওদের বাড়িতে গেলাম, আর
বেল বাজালাম।”
“এত সহজ?”
“এতটা সহজ ছিল না। খুব কঠিন। আমি সেখানে দাঁড়ালাম,
অস্বস্তি নিয়ে ডোরবেলে টিপ দিলাম। তখন
পর্যন্ত আমি ভেবেছিলাম দরজা খোলার
চেয়ে বেল বেজে উঠা সহজতর হবে, আর
সেখানে বোকার মত দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায়
ধরা পড়ব।” “আর তোমার মুখের ওপর দরজা বন্ধ
করে দেয়নি সে?”
“না। যতটা সম্ভব, ওর ব্যবহার ছিল মধুর।
আমাকে ভিতরে আসতে বলল, ও জানত আমি কে,
বলল বেড়াতে এসেছি বলে ও খুব আনন্দিত।”
“আর তুমি প্রস্তাব করলে, আমরা মর্ফি’স পার্কে যাব।”
“হ্যা। আমি ভেবেছিলাম, যদি এমন কিছু
প্রস্তাব করি যা শিশুদেরকে আনন্দ করার
উপলক্ষ্য এনে দিবে, এটা ওর জন্য সহজ
হবে সাথে যাবার। ছেলের জন্য এ
অপ্রত্যাশিত সুযোগটা নষ্ট করতে চায়নি ও।” “এক জন মায়ের মনস্তত্ত্ব।”
“কিন্তু ওদের বাড়িটা তোমার
দেখতে যাওয়া উচিত।”
“আহ। এই সব বিষয়ে তোমার একটা আগ্রহ ছিল,
তুমি সব জানতে পেরেছ। তুমি কুক’স
ট্যুরে যেতে চেয়েছিলে। কিন্তু, দয়াকরে তাঁদের বাড়ির রঙবিন্যাসের
বিস্তারিত বিবরণ
দেওয়া থেকে আমাকে অব্যাহতি দিও।
বিছানার চাদর
সম্পর্কে জানতে আমি আগ্রহী নই, আর
খাসকামরার আকারের মত বিষয়, আমি বরাবরই এড়িয়ে চলি।”
লিলিয়ান জর্জের কোন কথাই কানে দিত না,
এটাই ছিল ওদের সুখী দাম্পত্যের গোপন
রহস্য। ও স্যাকারোদের বাড়ির রঙবিন্যাসের
বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে চলল,
সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে বলল বিছানার চাদর সম্পর্কে, আর খাসকামরার ইঞ্চি বাই
ইঞ্চি বর্ণনা দিল জর্জকে।
“আর পরিষ্কার? আমি কখনো কোন জায়গা এত
নিখুঁত দেখিনি।”
“যদি তুমি কারো সাথে পরিচিত হতে চাও,
তখন সে তোমাকে অসম্ভব একটা মানদণ্ডে বসাবে, আর তোমার নিজস্ব
সমর্থনের জন্যই তাঁকে ছাড় দিতে হবে।”
“ওর রান্নাঘর,” জর্জকে গ্রাহ্য না করেই
লিলিয়ান বলল, “এত পরিষ্কার,
তুমি দেখে বিশ্বাসই করতে পারবে না, ও
এটা কখনো ব্যবহার করেছে। পানি খেতে চাইলে, ট্যাপের নিচে গ্লাস
রেখে ও আস্তে আস্তে পানি ঢালল, যেন এক
ফোঁটা পানিও বাইরে না পড়ে। কোন ভান ছিল
না। ও এটা সচ্ছন্দে করল, আমি বুঝতে পারলাম
ও সব সময় এভাবেই কাজটা করে। আর যখন
আমাকে গ্লাসটা দিল, ও ওটা একটা পরিষ্কার রুমাল দিয়ে ধরে রেখেছিল। ঠিক
হাসপাতালের মত স্বাস্থ্যকর পরিবেশ।”
“সে এর জন্য নিজেই অনেক বিপদে পড়বে।
সে কি সাথে সাথেই আমাদের
সাথে আসতে রাজী হয়েছিল?”
“না… সাথে সাথেই না। ও আবহাওয়ার পূর্বাভাষ সম্পর্কে জানার জন্য ওর
স্বামীকে ডাকল। স্যাকারো সাহেব বলল, সব
পত্রিকাই বলেছে আগামীকালের
আবহাওয়া সুন্দর থাকবে। তবুও রেডিওর
সর্বশেষ রিপোর্টের জন্য
সে অপেক্ষা করছিল। ” “সব পত্রিকা তাই বলেছে, এহ?”
“অবশ্যই, তারা সবাই শুধু সরকারি আবহাওয়ার
পূর্বাভাষ মুদ্রণ করে, তাই তাদের সবার
রিপোর্ট এক হবে। কিন্তু আমার মনে হয়,
ওরা সবগুলো পত্রিকাই রাখে। কাগজের
ছেলেটাকে কমপক্ষে এক বান্ডিল পত্রিকা রেখে যেতে দেখেছি আমি…”
“বেশি কিছু আর বাকি নেই যা তোমার
চোখে এড়িয়ে গেছে, আছে কিছু?”
“যাই হোক,” লিলিয়ান অস্থিরভাবে বলল, “ও
আবহাওয়া অফিসে ফোন করেছিল,
তারা ওকে সর্বশেষ আবহাওয়ার পূর্বাভাষ জানাল। ও ওর স্বামীকে ডেকে সব বলল।
এরপর ওরা বলল, ওরা যাবে। এছাড়াও বলল,
যদি আবহাওয়ার আকস্মিক কোন পরিবর্তন ঘটে,
ওরা আমাদেরকে ফোন করে জানাবে।”
“ঠিক আছে। তাহলে আমরা যাবো।”
**** স্যাকারোরা দেখতে কমবয়সী ও হাসিখুশী,
শ্যামলা ও সুশ্রী। ঠিক যেখানে রাইটদের
গাড়িটি পার্ক করা ছিল,
বাড়ি থেকে নেমে ওরা সেদিকে লম্বা পদক্ষেপে এগোল।
জর্জ ওর স্ত্রীর দিকে ঝুঁকে, কানে কানে বলল,
“তাহলে স্যাকারো সাহেবই কারন।” “আমিও তাই আশা করছি,” লিলিয়ান বলল,
“সে যেটা বইছে, ওটা কি একটা হাতব্যাগ?”
“পকেট রেডিও। আবহাওয়ার পূর্বাভাষ শোনার
জন্য, আমি নিশ্চিত।”
স্যাকারোদের ছেলেটা ওদের
পিছনে দৌড়ে আসছিল কিছু একটা নাড়াতে নাড়াতে, যেটা বায়ুচাপ
মাপার যন্ত্রে রূপান্তরিত হল, ওরা তিন জনই
গাড়ির পিছনের সিটে গিয়ে বসল।
আলাপচারিতা শুরু হল, নৈর্ব্যক্তিক কিছু
বিষয়ে নিখাদ প্রশ্নোত্তর আদান-প্রদান,
মর্ফি’স পার্ক পর্যন্ত এভাবেই চলতে লাগল। স্যাকারোদের ছেলেটি এত ভদ্র ও
যুক্তিবাদী যে, টমি রাইট পর্যন্ত সামনের
সিটে ওর বাবা-মায়ের
মাঝখানে বসে সভ্যতার অনন্য দৃষ্টান্ত
স্থাপন করল। লিলিয়ান মনে করতে পারছিল
না, এত প্রশান্ত-সুখকর মোটরগাড়ি ভ্রমণ কবে সে কাটিয়েছিল।
স্যাকারো সাহেবের ছোট রেডিওটা চালু ছিল,
লিলিয়ান এর জন্য আদৌ বিরক্তবোধ করে নি,
আলাপচারিতার মাঝে রেডিওর শব্দ
সামান্যই শোনা যাচ্ছিল। প্রকৃতপক্ষে,
লিলিয়ান কখনই দেখে নি স্যাকারো সাহেব কদাচিৎ রেডিওটি তাঁর কানের
কাছে ধরে রাখছে।
মর্ফি’স পার্কে চমৎকার একটা দিন; উষ্ণ ও
শুকনো, অত্যধিক গরম পড়ে নি; নীলে, নীল
আকাশে প্রফুল্ল উজ্জ্বল সূর্য।
এমনকি স্যাকারো সাহেব, যদিও সে আকাশের প্রত্যেকটা অংশ সতর্ক
দৃষ্টি নিয়ে পরীক্ষা করল, গভীর
দৃষ্টি নিয়ে একটানা বায়ুচাপ মাপার
যন্ত্রের দিকে তাঁকিয়ে রইল, সেও মনে করল
খুঁজে বের করার মত কোন ত্রুটি নেই।
লিলিয়ান আমিউজমেন্ট সেকশনে ছেলে দুটিকে নিয়ে গেল, পর্যাপ্ত
সংখ্যক টিকিট কিনল যেন পার্কের প্রত্যেক
ধরণের রোমাঞ্চকর রাইডে ওরা চড়তে পারে।
“অনুগ্রহ করে,” মিসেস
স্যাকারোকে বাঁধা দিয়ে লিলিয়ানকে বলতে হয়েছে,
“আমাকেই করতে দিন। পরবর্তীতে আপনাকে সুযোগ দেব।”
লিলিয়ান যখন ফিরে এল, জর্জ একা।
“কোথায়…”, লিলিয়ান শুরু করল।
“খাদ্য ও পানীয় স্ট্যান্ডটার ঐ ওখানে।
আমি তাঁদেরকে বলেছি, তোমার জন্য
অপেক্ষা করছি। তুমি এলেই তাঁদের সাথে যোগ দেব।”, বিষণ্ণতা নিয়ে কথাগুলো বলল জর্জ।
“কোন সমস্যা হয়েছে?”
“না, সত্যিই না, শুধু মনে হচ্ছে,
স্যাকারো সাহেব সম্ভবত সহজাতভাবেই
সম্পদশালী।”
“কি বললে?” “আমি জানি না, সে জীবনধারণের জন্য
কি করে। আমি ইঙ্গিত করে বললাম …”
“এখন কে কৌতূহলী?”
“আমি তোমার জন্যই জানতে চাইছিলাম।
সে বলল, সে মানব প্রকৃতির একজন ছাত্র
মাত্র।” “কতটা দার্শনিক। ঐসব পত্রিকাগুলোই
এটা প্রমাণ দেয়।”
“হ্যা, কিন্তু একজন সুদর্শন, সম্পদশালী নিকট
প্রতিবেশী নিয়ে, এখন
দেখা যাচ্ছে আমি নিজেকেও একটা অসম্ভব
মানদণ্ডে বসিয়ে ফেলেছি।” “বোকার মত কথা বল না।”
“আর সে অ্যারিজোনা থেকে আসে নাই।”
“সে আসে নাই?”
“আমি বললাম,
আমি শুনেছি সে অ্যারিজোনা থেকে এসেছে।
তাঁকে খুব বিস্মিত দেখাচ্ছিল, এটা নিশ্চিত সে অ্যারিজোনার নয়। এরপর
সে হেসে জানতে চাইল, তাঁর কথার টান
অ্যারিজোনার মত কিনা।”
লিলিয়ান চিন্তিতভাবে বলল, “তুমি জানো,
তাঁর কথায় কিছু একটা টান আছে। দক্ষিণ
পশ্চিমে স্প্যানিশ বংশোদ্ভূত অনেক লোক বাস করে, তাই সে অ্যারিজোনারই হবে।
স্যাকারো একটা স্প্যানিশ নাম হতে পারে।”
“জাপানী বলে মনে হচ্ছে আমার কাছে। …
বাদ দাও, তাঁদেরকে দেখা যাচ্ছে। ওহ, দেখ
তাঁরা কি কিনেছে।”
স্যাকারোরা প্রত্যেকেই হাওয়াই মিঠাইয়ের তিনটি কাঠি ধরে আছে, চিনির
তন্তুতে তৈরী গোলাপী ফোমের প্রকাণ্ড চক্র
যা ফেনিল সিরাপ শুকিয়ে উষ্ণপাত্র
থেকে পেঁচিয়ে উঠিয়ে আনা হয়েছে।
এটা মধুরভাবে মুখের ভিতরে গলে যায়, আর
একটা আঠালো অনুভূতি রয়ে যায়। স্যাকারোরা প্রত্যেকেই একটি করে প্রত্যেক
রাইটের সামনে ধরল,
ওরা বিনম্রভাবে ওগুলো গ্রহণ করল।
ওরা মধ্য পথের দিকে এগোল। বাণ নিক্ষেপের
চেষ্টা করল হাত দিয়ে, ওটা এক ধরণের
পোকার খেলা। ওরা নিজেদের ছবি তুলল, কণ্ঠ রেকর্ড করে রাখল, আর
পাঞ্জা লড়ে শক্তি পরীক্ষা করল।
অবশেষে ওরা ছেলে দুটিকে আয়ত্তে আনল,
এদিক ওদিক রুদ্ধশ্বাসে ছুটাছুটি করে কাহিল
হয়ে পড়েছিল ওরা।
স্যাকারোরা ওদেরকে সাথে সাথেই খাদ্য ও পানীয় স্ট্যান্ডের কাছে নিয়ে এল।
টমি ইঙ্গিত করে আগ্রহ প্রকাশ করল ওর জন্য
সম্ভাব্য একটা হট-ডগ কেনার ব্যাপারে।
জর্জ কাছে ডাকতেই, ও দৌড়ে এল।
“সত্যি বলতে,” জর্জ বলল,
“আমি এখানে থাকতেই পছন্দ করছি। যদি ওদেরকে আরেকটা হাইয়াই মিঠাইয়ের
কাঠিতে কামড় দিতে দেখি, আমি সবুজ
হয়ে এখানেই অসুস্থ হয়ে পড়ব।
যদি তাঁরা প্রত্যেকেই এক ডজন
করে খেয়ে না থাকে, আমি নিজেই এক ডজন
খাবো।” “আমি জানি, ওরা এখন মুঠো ভরে কিনছে ওদের
ছেলেটার জন্য।”
“আমি স্যাকারোকে একটা হ্যামবার্গার
খেতে সেধেছিলাম,
সে বিকটভাবে তাঁকিয়ে মাথা নাড়ল।
একটা হ্যামবার্গারও খেল না, অথচ পর্যাপ্ত পরিমাণ হাওয়াই মিঠাই খেয়ে তাঁদের ভোজন
শেষ হবে।”
“আমি জানি। আমি ওকে এক গ্লাস কমলালেবুর
শরবত সেধেছিলাম, ও না বলার সময়
এমনভাবে লাফ দিয়ে উঠল, তোমার
মনে হবে আমি যেন ওটা ওর মুখের ওপর ছুঁড়ে মারছিলাম। আমার ধারণা, ওরা এধরণের
জায়গায় আগে কখনো আসেনি। নূতনত্বের
সাথে মানিয়ে নিতে ওদের সময় লাগবে।
ওরা মন ভরে হাওয়াই মিঠাই খাচ্ছে, এরপর
আগামী দশ বছরের মধ্যে আর কখনই
ওটা খাবে না।” “বেশ, হয়তবা।”
ওরা ধীরে ধীরে হেঁটে স্যাকারোদের
দিকে এগোচ্ছিল। “দেখো, লিল, আকাশে মেঘ
জমছে।”
স্যাকারো সাহেব রেডিওটা তার কানের
কাছে ধরে উদ্বিগ্ন হয়ে পশ্চিমের দিকে তাঁকাচ্ছিল।
“উহ-ওহ,” জর্জ বলল, “সে এটা দেখেছে।
বাজি ধরলে একের জন্য তুমি পঞ্চাশ
করে পাবে, সে এখন বাড়ি যেতে চাইবে।”
স্যাকারোরা তিনজনই এখন জর্জের
সামনে দাঁড়িয়ে, শিষ্ট কিন্তু দ্ব্যর্থহীন। ওরা দুঃখিত, ওরা একটা চমৎকার সময়,
একটা অবিশ্বাস্য সময় কাটাল,
রাইটারা ওদের অতিথি হবে, যত দ্রুত সম্ভব
এর ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু এখন, সত্যিই,
ওদের বাড়ি ফিরতে হবে। ঝড়
আসবে মনে হচ্ছে। মিসেস স্যাকারো বিলাপ করে বলল, সকল
পূর্বাভাষ বলেছিল বৃষ্টিপাত হবে না,
আবহাওয়া সুন্দর থাকবে।
জর্জ ওদেরকে শান্তনা দেবার চেষ্টা করল,
“স্থানীয় বজ্রসহ ঝড়-
বৃষ্টি সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বানী করা কঠিন, কিন্তু এমনকি এটা যদি চলেও আসে, আধ ঘন্টার
বেশি স্থায়ী হবে না।”
এই কথায়, স্যাকারোদের ছেলেটা প্রায়
কেঁদে ফেলছিল, আর মিসেস স্যাকারোর
হাতে ধরা রুমালটি দৃশ্যমানভাবে কেঁপে উঠল।
“চলুন বাড়ির দিকে যাই,” বশ্যতা স্বীকার করে বলল জর্জ।
****
ফিরে যাওয়ার সময় যাত্রাটা মনে হচ্ছিল
অনেক লম্বা, অনন্ত ও একঘেয়ে। কোন
আলাপচারিতা নেই। স্যাকারো সাহেবের
রেডিওটা বেশ উচ্চস্বরে বাজছে, এক স্টেশন থেকে আরেক স্টেশনে যেয়ে প্রতি মূহুর্তের
আবহাওয়ার রিপোর্ট ধরার চেষ্টা করছে সে।
ওরা রিপোর্টে মন্তব্য করছে, এখন “বজ্রসহ
বৃষ্টিপাত” হবে।
স্যাকারোদের ছেলেটা বলে উঠল, বায়ুচাপ
মাপার যন্ত্রের কাঁটাটা পড়ছে, আর মিসেস স্যাকারো চিবুকের নিচে হাতের তালু
রেখে বিষণ্ণ হয়ে একটানা আকাশের
দিকে চেয়ে থেকে জর্জকে অনুরোধ করল, সম্ভব
হলে যেন গাড়িটা আরো দ্রুত চালানো হয়।
“বেশ আশঙ্কাজনক দেখাচ্ছে, তাই না?”
লিলিয়ান বিনীতভাবে বললেন ওদের অতিথির অঙ্গভঙ্গির সাথে মানিয়ে নিতে।
কিন্তু জর্জ মিসেস স্যাকারোর শ্বাস-
প্রশ্বাসের নিচে চাপা পড়া কথাটা শুনলেন,
“দয়া করে!”
বাতাস বইতে শুরু করল, সপ্তাহের পর সপ্তাহ
শুকনো রাস্তার ধুলো উড়তে লাগল। যখন ওরা রাজপথে উঠে এল, যেখানে ওরা থাকে,
সেখানে পাতাগুলো অশুভভাবে মর্মর
করে উঠল। বিদ্যুৎ চমকে উঠল।
জর্জ বলল, “বন্ধু, আপনারা আর দুই মিনিটের
মধ্যেই বাড়ির ভিতরে পৌছে যাবেন,
আমরা এটা পারব।” জর্জ দরজার কাছে এসে থামাল,
যা স্যাকারোদের প্রশস্ত সম্মুখ উঠোন
মেলে ধরল, গাড়ি থেকে নেমে পিছনের
দরজা খুলে দিল। ও ভেবেছিল, ও
নামিয়ে দিতে পেরেছে। ওরা ঠিক সময়েই
এসেছে। স্যাকারোরা গড়িয়ে নামল, মুখে দুশ্চিন্তার
রেখা টেনে বিড়বিড় করে ধন্যবাদ জানাল।
এরপর ওদের দীর্ঘ সম্মুখ উঠোনের
দিকে ভয়ানক গতিতে হেঁটে গেল।
“সত্যি বলতে,” লিলিয়ান শুরু করল,
“তুমি চিন্তা করেছিলে ওরা পৌছুতে…” আকাশ খুলে গেল, আর বড় বড় ফোঁটায়
বৃষ্টি নেমে এল যেন স্বর্গের বাঁধ হটাৎকরেই
ফেটে পড়েছে।
ওদের গাড়ির উপরিভাগে সজোরে শত শত
ড্রামের কাঠির আঘাত পড়ছিল, আর সম্মুখ
দরজার মাঝপথে স্যাকারোরা থেমে গেল, নৈরাশ্য নিয়ে উপরের দিকে তাঁকাল।
বৃষ্টির আঘাতে ওদের মুখগুলো ঝাপসা হয়ে এল;
ঝাপসা ও কোঁচকানো। একসাথে ওরা দৌড় দিল।
তিনজনই কোঁচকিয়ে গেল, কাপড়-চোপড়ের
মধ্যে ভেঙে পড়ল, যা ডুবে গেল
তিনটি আঠালো-আদ্র স্তুপের মাঝে। যখন রাইটারা ওখানে পৌছল, বিষম
ভয়ে এফোঁড় ওফোঁড় বিদ্ধ হয়ে, লিলিয়ান
নিজেকে থামাতে অসমর্থ হল ওর এই
মন্তব্যটি শেষ করতে, “… চিনির তৈরী, ভয়
হচ্ছে ওরা গলে যাবে।”
Read More...

Saturday, August 18, 2012

জহির রায়হানের কিচু বই

4 comments

জহির রায়হান ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট
ফেনী জেলার মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর আসল নাম মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ।
তিনি কলকাতার মিত্র ইন্সটিউট
আলিয়া মাদ্রাসায় প্রাথমিক
লেখাপড়া করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তিনি তাঁর পরিবারের
সাথে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব
পাকিস্তান) ফিরে আসেন। ১৯৫০
সালে ফেনীর আমিরাবাদ হাইস্কুল
থেকে মেট্রিক ও ১৯৫৩ সালে জগন্নাথ কলেজ,
ঢাকা (বর্তমানে জগ্ননাথ বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে আইএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহন করেন।
১৯৫২ সালে প্রমথেশ বড়ুয়া মেমোরিয়াল
ফটোগ্রাফি স্কুলে (কলকাতা) ভর্তি হন।
মেডিক্যাল কলেজে (১৯৫৬-৫৮) ভর্তি হয়েও,
চিকিৎসাশাস্ত্রের কোর্স শেষ না করেই
কলেজ ত্যাগ করেন। ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বিএ
(অনার্স) ডিগ্রী লাভ করেন। তিনি ব্যক্তিগত
জীবনে দু’বার বিয়ে করেন: ১৯৬১
সালে সুমিতা দেবীকে এবং ১৯৬৬
সালে তিনি সুচন্দাকে বিয়ে করেন, দুজনেই ছিলেন সে সময়কার বিখ্যাত চলচ্চিত্র
অভিনেত্রী।
১৯৪৯ সালে কলকাতার নতুন সাহিত্য
পত্রিকা থেকে ওদের জানিয়ে দাও
নামে প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। ১৯৫৫
সালে তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ সূর্য গ্রহণ ও
১৯৬০ সালে প্রথম উপন্যাস শেষ বিকেলের
মেয়ে প্রকাশিত হয়।
জহির রায়হান দেশ স্বাধীন হবার পর তার
নিখোঁজ ভাই, প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক ও
সাংবাদিক শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে শুরু
করেন,যিনি স্বাধীনতার ঠিক
আগমুহূর্তে পাকিস্তানী আর্মির এদেশীয়
দোসর আল বদর বাহিনী কর্তৃক অপহৃত হয়েছিলেন। ১৯৭২ সালের ৩০
জানুয়ারী জহির রায়হান ভাইয়ের
সন্ধানে মিরপুরে যান এবং সেখান থেকে আর
ফিরে আসেননি। মিরপুর ছিল
ঢাকা থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত
বিহারী অধ্যুষিত এলাকা এবং এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে যে সেদিন বিহারীরা ও
ছদ্মবেশী পাকিস্তানী সৈন্যরা বাংলাদেশীদের
ওপর গুলি চালালে তিনি নিহত হন।
তার কিচু বই ডাওনলোড করুনঃমিডিয়াফায়ার থেকে


হাজার বছর ধরে(১৯৬৪)


বরফ গলা নদী(১৯৬৯)


আর কতদিন(১৯৭০)


গল্প সমগ্র
Read More...

ও. হেনরীর ছোট গল্প :দি লাস্ট লিফ

Leave a Comment
ওয়াশিংটন স্কয়ারের পশ্চিমে এক ছোট জেলা,
যেখানে রাস্তাগুলো অনিরাপদভাবে ছুটে চলেছে এবং ভেঙে ভেঙে নিজেদের
ভিতরে ছোট ছোট ‘গলি’ তৈরী করেছে। এই
গলিগুলোতে গড়ে উঠেছে অদ্ভুত সব
কোণা কানছি আর বাঁক। একটি রাস্তা নিজের
উপর দিয়ে এক দুইবার করে অতিক্রম করে গেছে। একবার এক চিত্রশিল্পী এই
রাস্তাটির মাঝে এক মূল্যবান
সম্ভাবনা আবিষ্কার করে বসলেন। মনে করুন,
একজন সংগ্রাহক রঙ, কাগজ এবং ক্যানভাসের
জন্য বিল সাথে নিয়ে এই পথের
মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, হঠাৎকরে দেখল সে আগের জায়গায়ই ফিরে এসছে, এর জন্য
তাকে এক পয়সাও খরচ করতে হয় নি! তাই, চিত্রশিল্পীরা খুব
তাড়াতাড়ি ঘুরতে ঘুরতে এই অদ্ভুত
পুরনো গ্রিনিচ গ্রামে চলে এল, খুঁজে বের করল
উত্তর দিকের জানালাসহ আঠার শতকের
পুরনো গ্যাবল (ডাচ গ্যাবল জ্যাকোবিয়ান
সময়ের ইংল্যান্ডের বিশেষ স্থাপত্যের বাড়ী), কম ভাড়ায় এক ডাচ চিলেকোঠা। এরপর
তাঁরা ছয় নম্বর এভিনিউ থেকে রান্না করা ও
খাবার গরম রাখার জন্য চুল্লিযুক্ত দুই
একটি পাত্র এবং কিছু পিউটর মগ
নিয়ে এসে এখানে কলোনি গড়ল। তিন তালা পাকা বাড়িটির নীচ তলায় ছিল
সিউ ও জনসির স্টুডিও। ‘জনসি’
জোয়ান্না নামে পরিচিত ছিলেন। একজন
এসেছিল মেইন থেকে, অন্যজন
ক্যালিফোর্নিয়া। আট নম্বর স্ট্রীটের
“ডেলমনিকো’স” হোটেলের খাবার টেবিলে তাঁদের পরিচয় হল
এবং তাঁরা দেখলেন শিল্প, চিকরি সালাদ ও
বিশপ স্লিভ (ফুল হাতার জামা বিশেষ) এ
তাঁদের রূচির অনেক মিল, যার ফলশ্রুতিতে এই
যৌথ স্টুডিওটি দাঁড়িয়ে গেল। সময়টা ছিল মে মাস। নভেম্বরে এক শীতল,
অদেখা আগন্তুক, যাকে ডাক্তাররা ডাকত
নিউমোনিয়া, কলোনিতে জেকে বসল, তাঁর
হিমশীতল আঙুলগুলো এখানে সেখানে স্পর্শ
করল। এই
ধ্বংসকারী দুঃসাহসিকভাবে লম্বা লম্বা পা ফেলে পূর্ব দিকে এগোলেন, তার শিকারকে আঁচড়
বসিয়ে সজোরে আঘাত করলেন, কিন্তু এই সরু ও
শেওলা পড়া গোলক ধাঁধার ‘গলি’ দিয়ে তার
পা আস্তে আস্তে পথ মাড়াল। একজন আদর্শ নাইট, বয়স্ক সজ্জন
ব্যক্তিকে আপনি যা ডাকতে পারেন,
নিউমোনিয়া সাহেব তেমনটি নন।
ক্যালিফোর্নিয়ার মৃদুমন্দ পশ্চিমা বায়ুর
সহানুভূতির পাত্র রক্তশূন্য ছোট মেয়েটি ছিল
লাল মুঠো, স্বল্পস্থায়ী শ্বাস-প্রশ্বাসের নির্বোধ বুড়োটার জন্য নামেমাত্র বৈধ
আক্রমণস্থল। তাই জনসিকে সে সজোরে আঘাত
করে বসল; জনসি বিছানায় পড়ে গেল,
হাঁটা চলা করত না বললেই চলে, নিজের
আলপনা আঁকা লোহার খাটে শুয়ে শুয়ে ছোট ডাচ
জানালার শার্সির কাচের ভিতর দিয়ে সামনের পাকা বাড়িটার শূন্য দিকটায়
চেয়ে থাকত। একদিন সকালে সিউয়ের আমন্ত্রণে উস্কখুস্ক,
ধূসর ভ্রু’র এক ব্যস্ত ডাক্তার
বিল্ডিংয়ে এলেন। “তাঁর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা দশে এক ”,
ডাক্তার তাঁর ক্লিনিক্যাল থার্মোমিটারের
পারদ ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বললেন, “এবং তাঁর
জন্য এই সম্ভাবনাটি হল তাঁর নিজের
বেঁচে থাকার ইচ্ছা। শেষ সীমানায়
পৌছে যাওয়া মানুষ জন এই উপায়েই আবার ফিরে আসে – যে সীমানায় মৃত্যুদূত সমগ্র
ফার্মাকোপিডিয়াকে নিরর্থক
বানিয়ে ফেলে। আপনার এই ছোট
মেয়েটি নিজের মনকে বুঝিয়েছে সে আর সুস্থ
হতে যাচ্ছে না। তাঁর মনে এছাড়া আর
অন্যকিছু আছে কি?” “সে – সে কিছুদিন নেপলস
উপসাগরকে আঁকতে চেয়েছিল।”, সিউ বলল। “চিত্রাঙ্কণ? – নাহ! তাঁর মনে গুরুত্বপূর্ণ
কোনো চিন্তা দুইবার এসেছিল কি – যেমন
ধরুন কোনো মানুষকে নিয়ে?” “কোনো মানুষ?”, জিউ’স হার্পের (এক ধরণের
বাদ্য বিশেষ) টুং টাং শব্দের মত কর্কশ
নাকি সুরে সিউ বলল, “কোনো গুরুত্বপূর্ণ মানুষ
– কিন্তু, না, ডাক্তার; এমন কিছু হয় নি।” “আচ্ছা, এটাই তাহলে তাঁর দুর্বলতা”,
ডাক্তার বলল। “আমার সামর্থ্যের
মধ্যে যতটুকু সম্ভব, বিজ্ঞান
অনুসারে আমি তার সবটুকুই করব। কিন্তু যখনই
আমার রোগী তাঁর শব যাত্রার দিন গুনতে শুরু
করবে, আমি ঔষধের উপশম-সহায়ক ক্ষমতা অর্ধেকে নামিয়ে নিয়ে আসবো। নতুন
শীতের ধরনে তাঁর ক্লোক স্লিভে (ফুল হাতার
আলখাল্লা বিশেষ) কেমন
লাগছে যদি আপনি তাঁকে প্রশ্নটি জিজ্ঞাসা করতে পারতেন,
আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি তাঁর বেঁচে থাকার
সম্ভাবনা বেড়ে দশে একের পরিবর্তে পাঁচে এক হবে।” ডাক্তার চলে গেলে, সিউ তাঁর
ওয়ার্করুমে গিয়ে নরম
জাপানী ন্যাপকিনে মুখ ঢেকে কাঁদলেন।
এরপর সে তাঁর ড্রয়িং বোর্ড নিয়ে তর্জন
গর্জন করতে করতে জনসির
রুমে গিয়ে সিটি বাঁজিয়ে র্যাগটাইম (১৯২০ এর দশকের নিগ্রোদের জনপ্রিয় গান)
গাইতে লাগলেন। জনসি কাঁথার নিচে বড়ো জোর একটু
নড়াচড়া করে, জানালার দিকে মুখ
করে শুয়ে রইল। সিউ
সিটি বাঁজানো থামিয়ে ভাবলেন,
জনসি ঘুমিয়ে আছে। সে তাঁর বোর্ড সাজিয়ে ম্যাগাজিনের গল্প
ফুটিয়ে তোলার জন্য কলম-কালি দিয়ে চিত্র
আঁকতে শুরু করলেন। একজন নবীন
চিত্রশিল্পীকে শিল্পকলায়
প্রতিষ্ঠা পেতে হলে অবশ্যই ম্যাগাজিনের
গল্পের জন্য চিত্র আঁকতে হয়, যেমন একজন নবীন লেখককে প্রতিষ্ঠা পেতে গল্প
লিখতে হয় ম্যাগাজিনের জন্য। সিউ ঘোড়-দৌড়ে পড়ার জন্য এক জোড়া রুচিশীল
পায়জামা এবং গল্পের নায়ক, এক
ইডাহো (যুক্তরাষ্ট্রের একটি অঙ্গরাজ্য)
রাখালের একপার্শ্বিক চিত্রের স্কেচ
আঁকছিলেন, তখন সে বেশ কয়েকবার
পুনরাবৃত্তিসহ নিচু স্বরের একটি শব্দ শুনতে পেলেন। সে দ্রুত বিছানার
পাশে ছুটে গেলেন। জনসির চোখ পুরোপুরি খোলা ছিল।
সে জানালার বাইরে তাঁকিয়ে গুনছিল –
উল্টো দিক থেকে গননা। “বারো”, সে বলল, এবং অল্প সময় পরে,
“এগারো”; এরপর “দশ”, “নয়”; “আট”, সাত”,
প্রায় এক সাথেই। সিউ উৎকণ্ঠিতভাবে জানালার
বাইরে তাঁকালো। কি আছে সেখানে গোনার
মতো? সেখানে দেখা যাচ্ছিল এক শূন্য,
বিষণ্ণ উঠোন, এবং কুড়ি ফুট দূরে এক
পাকা বাড়ির শূন্য অংশ। একটি পুরনো,
গাঁটযুক্ত ও ক্ষয়ে যাওয়া শিকড়যুক্ত বয়স্ক আইভি লতা ইটের দেয়ালের অর্ধেকটায়
বেয়ে উঠেছিল। পরিত্যক্ত ইটের
দেয়ালে প্রায় শূন্য লতাটির
কাঠামো প্রশাখা দৃঢ়ভাবে লেগেছিল, যতক্ষন
পর্যন্ত না হেমন্তের শীতল
হাওয়া লতাটি থেকে পাতাগুলোকে দুর্বল করে ফেলেছিল। “কি করছো, সোনা?” সিউ জিজ্ঞাসা করল। “ছয়”, প্রায় ফিসফিস করে বলল জনসি।
“ওরা এখন খুব দ্রুত পড়ে যাচ্ছে। তিন দিন
আগেও প্রায় একশটা ছিল।
ওগুলো গুনতে গুনতে আমার
মাথাটা ধরে এসেছিল। কিন্তু এখন সহজ
হয়ে এসেছে। আরেকটা পড়ে গেল। এখন আর মাত্র পাঁচটি বাকি আছে।” “পাঁচটি কি, সোনা? তোমার সিউডিকে বলো?” “পাতা। আইভি লতার। যখন শেষ
পাতাটি পড়ে যাবে, আমিও অবশ্যই
চলে যাবো। তিন দিন হল এটি আমি জেনেছি।
ডাক্তার কি তোমাকে বলে নি?” “ওহ! এই ধরনের অর্থহীন কথা আমি আর
কখনো শুনি নি,” আশ্চর্যরকম অবজ্ঞার
সুরে অভিযোগ করে বলল সিউ। “তোমার সুস্থ
হয়ে যাওয়ার সাথে বুড়ো আইভি পাতার
কি সম্পর্ক? তুমি ঐ লতাকে খুব
বেশি ভালোবেসে ফেলেছো, দুষ্ট মেয়ে। বোকার মত আচরন করো না। কেন, ডাক্তার
তো আজ সকালেই আমাকে বলল তোমার দ্রুত সুস্থ
হয়ে যাবার ভালো সম্ভাবনা আছে –
মনে আছে তোমার, ডাক্তার ঠিক কি বলেছিল –
সে বলল, সম্ভাবনা দশে এক! কেন,
এটা তো প্রায়ই একটি ভালো সম্ভাবনা হতে পাড়ত
যদি আমরা নিউ ইয়র্কে স্ট্রিট
কারে চড়ে ঘুরে বেড়াতাম অথবা একটি নতুন
বিল্ডিংয়ের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতাম। এখন
কিছুটা স্যুপ খাওয়ার চেষ্টা করো এবং তোমার
সিউডিকে তাঁর ড্রয়িংয়ের কাছে আবার ফিরে যেতে দাও, যাতে সে ওগুলো সম্পাদক
সাহেবের কাছে বিক্রি করে তাঁর অসুস্থ
বাচ্চাটার জন্য পোর্ট ওয়াইন (পর্তুগালের
গাঢ় লাল বা সাদা, উগ্র, মিষ্ট মদ বিশেষ)
এবং নিজের জন্য লোভনীয় শুকরের চপ
কিনতে পারে।” “তোমাকে আর ওয়াইন কিনতে হবে না,”
জানালার বাইরের তাঁর দৃষ্টি স্থির রেখে,
জনসি বলল। “আরেকটা পড়ে গেল। না,
আমি কোনো স্যুপ চাই না। আর মাত্র
চারটা পাতা আছে। অন্ধকার নেমে আসার
আগেই আমি শেষ পাতাটির পড়ে যাওয়া দেখতে চাই। এর পরে আমিও
চলে যাবো।” “জনসি, সোনা,” তাঁর উপর নুয়ে পড়ে সিউ বলল,
“তুমি কি আমাকে কথা দিবে, তোমার
চোখদুটো বন্ধ রাখবে, এবং যতক্ষন পর্যন্ত
আমার কাজ শেষ না হয় তুমি জানালার
বাইরে তাঁকাবে না?
আমাকে ছবিগুলো কালকেই জমা দিতে হবে। আমার আলো দরকার, না হলে আমি পর্দা টেনেই
আঁকতাম।” “তুমি অন্য রুমে গিয়ে আঁকতে পারো না?”
নিষ্প্রাণভাবে বলল জনসি। “আমাকে এখানে তোমার পাশেও থাকতে হবে,”
সিউ বলল। “এছাড়া, আমি চাই না তুমি ঐসব
তুচ্ছ আইভি পাতার দিকে তাঁকিয়ে থাকো।” “তোমার কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই
আমাকে বোলো,” ফ্যাকাশে ও ভূপতিত স্ট্যাচুর
মত শুয়ে থেকে, চোখদুটো বন্ধ
রেখে জনসি বলল, “কারন আমি শেষ পাতাটির
পড়ে যাওয়া দেখতে চাই।
আমি অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত। আমি ভাবতে ভাবতে ক্লান্ত। আমি সকল বন্ধন
থেকে মুক্তি পেতে চাই, ক্রমশ
ডুবে যেতে চাই, ঠিক ঐসব নিঃস্ব, ক্লান্ত
পাতাগুলোর মত।” “ঘুমোতে চেষ্টা করো,” সিউ বলল। “বৃদ্ধ
নির্জনবাসী খনি-শ্রমিকের মডেল হবার জন্য
আমাকে বেহরম্যানকে ডাকতে যেতেই হবে।
আমার যেতে এক মিনিটও লাগবে না।
আমি না ফেরা পর্যন্ত নড়াচড়ার
চেষ্টা করো না।” বৃদ্ধ বেহরম্যান ছিলেন একজন পেইন্টার,
যিনি তাঁদের নিচে গ্রাউন্ড
ফ্লোরে থাকতেন। ষাট পেরোনো এই বুড়োর
মাইকেল এঞ্জেলোর ‘মোজেসে’র মত দাড়ি ছিল,
যেন স্যাটারের
মাথা থেকে কোঁকড়িয়ে নিচে নেমে এসেছে এবং দেহখানা খুদে শয়তানের মতো। (ইতালীর বিখ্যাত চিত্রকর ও ভাস্কর
মাইকেল এঞ্জেলোর ভাস্কর্য ‘মোজেস’; দুই
সুশোভিত মার্বেল স্তম্ভের
মাঝখানে মার্বেল চেয়ারে বসা মোজেস, যার
দীর্ঘ দাড়ি কোলের উপরে এসে পড়েছে।
মোজেস ইসলাম ধর্মে মুসা নবী নামে পরিচিত ও ইহুদী ধর্মের প্রবর্তক। স্যাটার গ্রীক ও
রোমান পুরানে উল্লেখিত অর্ধমানব ও
অর্ধপশুরূপী বনদেবতা।) বেহরম্যান
চিত্রশিল্পে ছিলেন ব্যর্থ। চল্লিশ বছর
ধরে ব্রাশ ঘষেও তাঁর গিন্নীর গাউনের
আঁচলের কাছাকাছি কিছু একটা আঁকতে পারেন নি। সে সবসময় তাঁর শ্রেষ্ঠ
চিত্রকর্মটি আঁকার কথা ভাবত, কিন্তু কখনোই
সেটা শুরু করতে পারে নি। বেশ কয়েক বছর
ধরে, কিছু ইতঃস্তত বাণিজ্যিক ও
বিজ্ঞাপনী আনাড়ি চিত্র আঁকা ছাড়া তেমন
কিছুই করতে পারে নি সে। কলোনির নবীন আঁকিয়ে যাদের পেশাদার চিত্রশিল্পীর
মতো অর্থ দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না, তাঁদের
মডেল হিসেবে কাজ করে সে অল্প কিছু
উপার্জন করত। সে মাত্রাতিরিক্ত জিন (মদ
বিশেষ) পান করত এবং সবসময় তাঁর আসন্ন
শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্মটি সম্পর্কে কথা বলত। বাকিটা সময় সে ছিল একজন
রাগী ছোটখাটো বুড়ো মানুষ, অন্যের স্নেহ-
মমতা পাওয়ার জন্য যে ছিল ক্ষুধার্ত,
এবং নিজেকে গণ্য করেছিল অপেক্ষমান
বিশেষ মাস্টিফ (প্রহরাকাজে দক্ষ, বড়
আকারের শক্তিশালী কুকুর বিশেষ) হিসেবে যে উপরের স্টুডিওটির দুই নবীন
চিত্রশিল্পীকে বাঁচাতে যাচ্ছিলেন। সিউ বেহরম্যানকে তাঁর
অনুজ্জ্বলভাবে আলোকিত আস্তানায়
প্রবলভাবে জুনিপার (চিরসবুজ গুল্ম বিশেষ)
ফলের ঘ্রাণ নিতে দেখতে পেলেন। এক কোণায়
কাঠের ফ্রেমে একটি শূন্য ক্যানভাস
সাজানো ছিল, শ্রেষ্ঠ চিত্রকর্মটির রূপ পেতে প্রথম রেখাটির জন্য যা পচিশ বছর
ধরে অপেক্ষা করে আছে। সিউ
বেহরম্যানকে জনসির অবাস্তব কল্পনার
কথা বলল, বলল কতটা শঙ্কিত দেখাচ্ছে তাঁকে,
নিজেকে তুচ্ছ ও ঠুনকো পাতার মত ভাবছে,
ভেসে চলে যাচ্ছে দূরে, পৃথিবীর প্রতি তাঁর ক্ষুদ্র বন্ধন ক্রমশ দুর্বলতর হচ্ছে। বুড়ো বেহরম্যানের রক্তিম চোখদুটোতে অশ্রুর
বন্যা বেয়ে গেল, সে চেঁচিয়ে এই নির্বোধ
ধরনের কল্পনাকে অবজ্ঞা ও উপহাস করল। “ধুর!” সে কেঁদে ফেলল। “পৃথিবীতে এমন লোকও
আছে, যারা তাঁদের নির্বুদ্ধিতার জন্য
মারা যাবে, এক দুর্দশাগ্রস্ত
লতা থেকে পাতাগুলো ঝরে পড়ে যাচ্ছে এই
কারনে? আমি এই ধরনের
কথা আগে কখনো শুনি নি। না, আমি আপনার বোকা নির্জনবাসী – নির্বোধ ব্যক্তির
মডেলের পোজ দিতে পারব না। এই ধরনের
বোকাটে কারবার কেন আপনি তাঁর মাথায়
আসতে দিলেন? আহ, বেচারা ছোট্ট মিস
জনসি।” “সে এখন খুবই অসুস্থ ও দুর্বল,” সিউ বলল, “
এবং জ্বর তাঁর মনটাকে অসুস্থ করে দিয়েছে,
আজব সব অবাস্তব কল্পনায় তাঁর মন
ভরে উঠেছে। খুব ভালো, বেহরম্যান সাহেব,
যদি আপনি আমার জন্য পোজ দিতে না চান,
আপনাকে প্রয়োজন নেই। কিন্তু আমার মনে হয় আপনি একজন কুৎসিত বুড়ো – গল্পগুজবপ্রিয়
বুড়ো ফচকে।” “আপনিও আর দশটা মেয়ে মানুষের মতো!”
চেঁচিয়ে উঠল বেহরম্যান। “কে বলল আমি পোজ
দিব না? চলুন। আমি আপনার সাথে যাচ্ছি।
আধা ঘন্টা ধরে আপনাকে আমি বলার
চেষ্টা করছি, পোজ দিতে আমি প্রস্তুত। হায়
ইশ্বর! এমন কোনো জায়গা থাকতে পারে না যেখানে মিস
জনসির মতো একজন ভালো মানুষকে অসুস্থ
হয়ে পড়তে হবে। একদিন আমি আমার শ্রেষ্ঠ
চিত্রকর্মটি আঁকব, এবং একদিন আমাদের
সবাইকে চলে যেতে হবে। হায় ইশ্বর! হ্যাঁ।” তাঁরা উপরের তলায় যখন গেল, জনসি তখন
ঘুমোচ্ছিল। সিউ জানালার চৌকাঠ পর্যন্ত
পর্দা টেনে দিয়ে বেহরম্যানকে ইশারা করে অন্য
রুমে যেতে বলল। সেখানে তাঁরা ভয়ের
সাথে জানালার
বাইরে উকি দিয়ে আইভি লতাটিকে দেখল। এরপর তাঁরা নিশ্চুপ থেকে কিছু সময়ের জন্য
একে অপরের দিকে তাঁকালো। তুষারপাতসহ
অবিরামভাবে শৈত্য বৃষ্টি পড়ছিল।
বেহরম্যান তাঁর পুরনো নীল
শার্টটি গায়ে চড়িয়ে, উল্টে রাখা কেটলির
উপর অবিচলিতভাবে নির্জনবাসী খনি – শ্রমিকের মত বসে পড়ল। পর দিন সকালে সিউ যখন তাঁর এক ঘন্টার ঘুম
থেকে জেগে উঠল, জনসিকে দেখতে পেল মলিন,
পুরোপুরি খোলা চোখ নিয়ে এক
দৃষ্টিতে টেনে দেয়া সবুজ পর্দাটার
দিকে তাঁকিয়ে আছে। “এটাকে উপরে টেনে দাও; আমি দেখতে চাই,”
জনসি ফিসফিসিয়ে নির্দেশ দিল। সিউ ক্লান্তভাবে নির্দেশ পালন করলেন। কিন্তু, দেখুন! সারা রাত ধরে তীব্র বৃষ্টিপাত
ও আকষ্মিক প্রবল ঝড়ো হাওয়া সহ্য করার
পরেও, ইটের
দেয়ালে একটা আইভি পাতা তখনো টিকে আছে।
এটা ছিল লতাটির শেষ পাতা। কান্ডের
কাছে এটি এখনো গাঢ় সবুজ; মলিন ও ক্ষয়ে যাওয়া খাঁজ কাটা হলুদ প্রান্ত নিয়েও
মাটি থেকে কুড়ি ফুট উপরে এক প্রশাখার
সাথে চমৎকারভাবে ঝুলে আছে। “এটাই শেষ পাতা,” জনসি বলল,
“আমি ভেবে ছিলাম, এটা নিশ্চিতভাবেই কাল
রাতে পড়ে গেছে। আমি বাতাসের শব্দ
শুনেছিলাম। এটা আজকে পড়ে যাবে, এবং তখন
আমিও মরে যাবো।” “সোনা, সোনা!” সিউ তাঁর মলিন
মুখখানা বালিশে চেপে বলল,
“যদি তুমি তোমার কথা ভাবতে না চাও,
তবে আমার কথা ভাবো। তাহলে আমি কি করব?” কিন্তু জনসি কোনো উত্তর দিল না।
একটি আত্না যখন তাঁর রহস্যময়, দূরের
যাত্রার জন্য প্রস্তুতি নেয়, তখন
এটি হয়ে দাঁড়ায় পৃথিবীর
মধ্যে সবচেয়ে বেশি একাকী আর দুঃখকাতর
কোনো অস্তিত্ব। অবাস্তব কল্পনা তাঁর মাঝে এত প্রবলভাবে ভর করে যেন সব ধরনের
বন্ধন যা তাঁকে বেঁধে ছিল বন্ধুত্বের মাঝে,
পৃথিবীর সাথে, এক এক করে মুক্ত হয়ে যায়। দিন পেরিয়ে গেল, এমনকি গোধূলির সময়ও
তাঁরা নিঃসঙ্গ আইভি পাতাটিকে দেয়ালের
উপর তার কান্ডের
সাথে দৃঢ়ভাবে এঁটে থাকলে দেখল।
এবং এরপর, রাত নেমে এলে উত্তরীয়
হাওয়া আবার বইতে শুরু করল, জানালার উপর বৃষ্টি আছড়ে পড়ল সেদিনও এবং ছাদের
সামনের দিকের নিচু অংশ দিয়ে টিপটিপ
করে বৃষ্টির পানি গড়িয়ে পড়ল। যখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করল,
হৃদয়হীনা জনসি পর্দাটিকে উপরে টেনে দিতে আদেশ
দিল। আইভি পাতাটি তখনো সেখানে ছিল। জনসি বিছানায় শুয়ে দীর্ঘ সময় ধরে এটার
দিকে তাঁকিয়ে থাকল। এরপর
সে সিউকে ডাকল, সিউ তখন গ্যাসের চুল্লীর
উপর রাখা চিকেন স্যুপকে চামচ
দিয়ে নেড়ে দিচ্ছিল। “আমি খারাপ মেয়ে হয়ে গেছি, সিউডি,”
জনসি বলল, “কোনো একটা কারনে শেষ
পাতাটি সেখানে থেকে গিয়ে আমাকে দেখাচ্ছে কতটা মন্দ
আমি। মরতে চাওয়াটা পাপ। তুমি আমাকে অল্প
একটু স্যুপ এনে দাও, আর কিছু পরিমান দুধের
সাথে অল্প একটু পোর্ট ওয়াইন, আর – না; প্রথমে তুমি আমার জন্য একটা হাত-
আয়না নিয়ে আসো, এর পর আমার কিছু বালিশ
জড়ো করো, আমি এর উপর বসে তোমার
রান্না করা দেখব।” এবং ঘন্টাখানেক পর সে বললঃ “সিউডি,
আশা করি এক দিন আমি নেপলস
উপসাগরকে আঁকতে পাড়ব।” ডাক্তার বিকেলের দিকে এল, এবং সিউ ওজর
দেখিয়ে ডাক্তারের সাথে বারান্দার
দিকে গেল। “এমনকি সুযোগ পেলে,” ডাক্তার সিউয়ের সরু
হাত নিজের হাতের মুঠোয়
নিয়ে ঝাকাতে ঝাকাতে বলল,
“ভালো সেবা দিয়ে আপনি জয়ী হবেন।” “এখন
আমাকে নীচতলার আরেকজন রোগীকে অবশ্যই
দেখতে যেতে হবে। বেহরম্যান,তাঁর নাম – এক প্রকার চিত্রশিল্পী বলতে পারেন,
আমি বিশ্বাস করি, তাঁরও
নিউমোনিয়া হয়েছে। সে একজন বুড়ো, দুর্বল
মানুষ, এবং আক্রমণটাও খুব মারাত্নক। তাঁর
বেঁচে থাকার কোনো আশা নেই; তবুও সে আজ
হাসপাতালে গিয়েছে আরো অধিক আরামবোধ করার জন্য।” পরের দিন ডাক্তার সিউকে বলল, “সে এখন
বিপদমুক্ত। আপনি জিতে গেছেন। পুষ্টিকর
খাবার আর যত্ন – এখন শুধু এইটুকুই যথেষ্ট।” জনসি যে বিছানায় শুয়েছিল সিউ সেই
বিকেলে সেখানে এল, একটি গাঢ় নীল
এবং ব্যবহারের একেবারেই অযোগ্য উলের
তৈরী কাঁধের স্কার্ফ মনের আশ
মিটিয়ে সেলাই করতে লাগল এবং অন্যহাত
দিয়ে জনসি, তাঁর বালিশ এবং চারপাশে বুলাতে লাগল। “আমার সাদা ইঁদুর, তোমাকে কিছু বলার
আছে আমার,” সিউ বলল, “বেহরম্যান সাহেব
আজ হাসপাতালে নিউমোনিয়ায় মারা গেছে।
সে মাত্র দুই দিন অসুস্থ ছিল। প্রথম দিন
সকালে দাঁড়োয়ানেরা তাঁকে নীচতলায় তাঁর
রুমে অসহায়ভাবে ব্যাথায় কাঁতারানো অবস্থায় পেয়েছিল। তাঁর জুতো ও
কাপর–চোপড় ছিল ভেজা এবং বরফ শীতল।
তারা কল্পনাও করতে পারে নি ঐ ভয়ঙ্কর
রাতে সে কোথায় ছিল। এরপর
তারা একটি লণ্ঠন দেখতে পেল,
সেটা তখনো জ্বলছিল, এবং আর একটি মই যেটি এখান থেকে টেনে নেওয়া হয়েছিল, আর
কিছু ইতস্তত ছড়ানো ব্রাশ এবং একটি প্যালেট
(চিত্রশিল্পীদের রঙ গোলা ও মেশানোর জন্য
ব্যবহৃত বোর্ডবিশেষ) যার উপর সবুজ এবং হলুদ
রঙ মেশানো হয়েছিল – জানালার বাইরের
দিকে দেয়ালের উপর শেষ আইভি পাতাটার দিকে একটু তাঁকাও, সোনা। তুমি কি একটুও
বিস্ময়াভিভূত হও না কেন বাতাস
বয়ে গেলে এটি দোলে না বা নড়াচড়া করে না?
ওহ সোনা! এটাই বেহরম্যানের
শ্রেষ্ঠচিত্রকর্ম – শেষ পাতাটি পড়ে যাবার
পর সেদিন রাতে সেখানে সে এটি এঁকেছে।”
Read More...

ও. হেনরীর ছোট গল্প : দি গিফট অব দি মেজাই

Leave a Comment
এক ডলার সাতাশি সেন্ট। এটুকুই সব। এর
মধ্যে ষাট সেন্ট আছে পেনিতে। একেক
সময়ে একটি দুইটি করে পেনি বাঁচানো হয়েছে মুদি দোকানী,
সবজী বিক্রেতা আর কশাইয়ের সাথে তীব্র দর
কশাকশি করে, এমন করেই পুঙ্খানুপুঙ্খ লেনদেন
চলেছে সব সময়, যতক্ষন পর্যন্ত না মনে মনে কৃপণ ঠাওরে তাদের মুখ আরক্তিম
হয়ে উঠেছে। ডেলা তিনবার গুনে দেখেছে।
এক ডলার সাতাশি সেন্ট। অথচ পরের দিন
ক্রিসমাস। মলিন ছোট আরাম কেদারাটার উপর
এগুলো ছুড়ে ফেলে চিৎকার
করে কান্না কাটি করা ছাড়া আর কোনো উপায়
নেই। ডেলা তাই করল। এটা মানুষের নৈতিক
অভিব্যক্তিকে এমনভাবে প্ররোচিত করে যেন,
জীবনটা ফুঁপিয়ে কাঁদা, দীর্ঘ শ্বাস আর মৃদু হাসির সম্মিলনে গড়া, যেখানে দীর্ঘ
শ্বাসটাই বেশি প্রবল। বাড়ীর গৃহকর্ত্রী যখন খরচ ক্রমশ প্রথম
থেকে দ্বিতীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনেন,
প্রথমেই তার নজর পড়ে বাড়ির দিকে।
একটি সুসজ্জিত ফ্ল্যাটের জন্য
প্রতি সপ্তাহে আট ডলার গুনতে হয়।
যারা দিন আনে দিন খায় ঠিক তাদের জন্য নয়, কিন্তু ভিক্ষুকের দলের জন্য
নিশ্চিতভাবেই অন্য কোনো উপায়
খুঁজে দেখতে হবে। প্রবেশ কক্ষের নীচে যে চিঠির
বাক্সটি আছে সেখানে কখনো কোনো চিঠি আসে না,
বৈদুতিক বোতামটি কোনো পার্থিব আঙুল
টিপে কখনো ঘন্টা বাঁজায় না। এর
নীচে অধিকার নিয়ে একটি নাম ফলক
শোভা পাচ্ছে, যাতে লেখা “মি. জেমস ডিলিংহাম ইয়াং”। আগেকার সমৃদ্ধ সময়ে “ডিলিংহাম” নামের
এই বাড়িটি প্রমোদ উল্লাসের মৃদুমন্দ
বাতাসে ভেসে বেড়িয়েছে, যখন এর মালিক
সপ্তাহে ত্রিশ ডলার পেত। এখন, যখন আয়
কমে কুড়ি ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে,
“ডিলিংহাম” এর অক্ষরগুলোও ঝাপসা দেখাচ্ছে, যেন তারাও
ঐকান্তিকভাবেই প্রত্যাশা করছে সংকুচিত
হয়ে যেয়ে নিরহঙ্কারী ও বিনয়ী “ডি” হতে।
কিন্তু যখনই মি. জেমস ডিলিংহাম
ইয়াং বাড়িতে ফেরেন এবং তাঁর এই
ফ্ল্যাটে আসেন, তাঁকে ডাকা হয় “জিম” এবং নিবিড় আলিঙ্গনে আবদ্ধ হন মিসেস জেমস
ডিলিংহাম ইয়াংয়ের, যিনি ইতোপূর্বেই
আপনাদের কাছে পরিচিত হয়েছেন “ডেলা”
নামে। যেখানে সবকিছুই খুব
ভালোভাবে চলছে। ডেলা তাঁর কান্না শেষ হলে, পাউডারের
ন্যাকড়াটা দিয়ে গাল মুছলো। জানালার
পাশে এসে দাঁড়িয়ে নিরানন্দ নিয়ে ধূসর
বাহিরবাড়ির ধূসর বেড়ার উপর দিয়ে ধূসর
বিড়ালটিকে হেঁটে যেতে দেখল। আগামীকাল
ক্রিসমাসের দিন, কিন্তু তাঁর কাছে আছে মাত্র এক ডলার সাতাশি সেন্ট,
যা দিয়ে জিমের জন্য উপহার কিনতে হবে।
সে প্রত্যেকটা পেনি বাঁচিয়ে মাসের পর মাস
ধরে, এই টাকাটা জমিয়েছে।
কুড়ি ডলারে সপ্তাহ বেশি দূর চলে না।
সে যা হিসাব করে, খরচ তার চেয়ে বেশি হয়ে যায়। সব সময়ই এমন হয়।
মাত্র এক ডলার সাতাশি সেন্ট আছে জিমের
জন্য উপহার কেনার। তাঁর জিম। সে অনেক
সুখী সময় কাটিয়েছে পরিকল্পনা করে করে,
কিছু চমৎকার জিনিস নিয়ে জিমের জন্য। কিছু
সুন্দর, দুর্লভ এবং খাঁটি…কিছু এমন একটা জিনিস, যা জিমের মর্যাদার সাথে খুব
কাছাকাছি মানিয়ে নেয় এমন মূল্যবান। কক্ষটির দুই জানালার মাঝে বৃহদাকার
লম্বাটে একটি আয়না আছে। এই ধরণের
বৃহদাকার লম্বাটে আয়না আপনি সম্ভবত আট
ডলারের ফ্ল্যাটগুলোতে দেখতে পাবেন। খুব
কৃশকায় এবং খুব চটপটে একজন নারী, দ্রুত
একের পর এক তাঁর পরিধেয় বস্ত্রগুলো লম্বালম্বিভাবে খুলে নগ্ন
হয়ে তাঁর প্রতিবিম্ব দেখেলে,
তিনি দেখতে কেমন সম্পূর্ণভাবে তার
একটা নিখুত ধারণা পেতে পারে।
ডেলা কৃশকায় হওয়ায়, এই কৌশলটি প্রয়োগ
করত। হঠাৎকরেই
সে জানালা থেকে সরে এসে আয়নার
সামনে দাঁড়াল। উজ্জ্বলভাবে তাঁর
চোখদুটি ঝিলিক দিচ্ছিল, কিন্তু
কুড়ি সেকেন্ডের মধ্যেই তাঁর মুখের রঙ
হারিয়ে গেল। দ্রুত সে তাঁর চুল টেনে নামিয়ে পূর্ন দৈর্ঘ্যে পড়তে দিল। বর্তমানে, দুটি সম্পদ আছে জেমস ডিলিংহাম
ইয়াংয়ের অধিকারে, যার উভয়েই বড় গর্বের
ধন। একটি জিমের স্বর্ণের ঘড়ি, যা ছিল তাঁর
পিতার এবং পিতামহের। অন্যটি ডেলার চুল।
যদি শেবার রানী ঘুলঘুলির
পাশে একটি ফ্ল্যাটে বাস করতেন, তবে ডেলা তাঁর চুল শুকানোর জন্য
সেগুলোকে তাঁর জানালার
সামনে ঝুলিয়ে রাখতো কিছুদিন,
এতে মহামান্যার গহনা ও উপহারগুলোর মূল্য
পড়ে যেত। যদি রাজা সলোমন তাঁর ভূ-গর্ভস্থ
কক্ষগুলোতে জমানো গুপ্তধনের দ্বাররক্ষী হতেন, তবে জিম সে স্থান
দিয়ে যাবার সময় প্রত্যেকবার তাঁর
ঘড়িটি দেখিয়ে আসতো, শুধুমাত্র দেখার জন্য
কেমন করে তিনি হিংসায় তাঁর
দাড়ি ধরে টানেন। ডেলার সুন্দর চুলগুলো এখন তাঁর শরীরের
উপরে পড়ে আছে, যেন জলপ্রপাতের পিঙ্গল
জলের মত মৃদু হিল্লোল তুলে ঝিলিক দিচ্ছে।
চুলগুলো তাঁর হাঁটুর নীচে নামে এবং পোষাক
হয়ে প্রায়ই যেন তাঁর শরীরকে ঢেকে দেয়।
সে বিচলিত হয়ে দ্রুত আবার তাঁর শরীরকে চুলগুলো দিয়ে ঢাকলো। হঠাৎ সে এক
মিনিটের মত কেঁপে উঠে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো,
এক দুই ফোটা চোখের জল গড়িয়ে পড়ল জীর্ণ
লাল কার্পেটটিতে। পুরনো পিঙ্গল জ্যাকেটটি পড়ে, পুরনো পিঙ্গল
হ্যাটটি মাথায় দিয়ে সে বের হল। দ্রুত
আবর্তিত হয়ে আসা স্কার্ট
পড়ে এবং এখনো দীপ্তিময় উজ্জ্বল
চোখদুটি নিয়ে, এলোমেলো অবস্থায় সে দড়জার
বাইরে এলো এবং সিঁড়ি বেয়ে রাস্তায় নামল। একটা সাইনবোর্ডের সামনে এসে সে থামলো,
“মিসেস সফরোনী। সকল ধরণের কেশ
সামগ্রী”। একরকম
উড়ে দৌড়ে চলে সে হাঁপিয়ে উঠলো। মাদাম,
দীর্ঘ, খুব শাদা, আকর্ষণীয়া, কদাচিৎ
দেখা মিলে “সফরোনী”। “আপনি কি আমার চুল কিনবেন?”,
ডেলা জিজ্ঞেস করে।
“আমি চুল কিনি”, মাদাম বলল। “আপনার
হ্যাটটি খুলে আমাকে একবার দেখতে দিন
এটি দেখতে কেমন?”
পিঙ্গল জলপ্রপাত মৃদু হিল্লোল তুলে নীচে নেমে এল।
“কুড়ি ডলার”, মাদাম বলল, নিপুন
হাতে একগোছা চুল উপরে তুলে ধরল।
“আমাকে টাকাটা এখনই দিন”, ডেলা বলল। আহা, নষ্ট পাথুরে সময়কে ভুলে গিয়ে, এর
পরের দুই ঘন্টা ধরে সে যেন গোলাপী ডানায়
ভর করে নেচে বেড়ালো। দোকানগুলোতে তন্ন
তন্ন করে জিমের জন্য উপহার খুঁজে বেড়ালো। অবশেষে সে উপহারটি খুঁজে পেল।
এটি নিশ্চিত জিমের জন্যই বানানো হয়েছে,
অন্য কারো জন্য নয়। অন্য দোকানগুলোতে এর
মত আর একটিও নেই, সে তাদের সবগুলোই
উল্টে পাল্টে দেখেছে। এটি ছিল
প্ল্যাটিনামের ঘড়ির চেইন, নকশায় সহজ ও সরল, কেবল বস্তুমান বিচারেই
যথার্থভাবে এর তাৎপর্য প্রকাশ করছিল,
বাহ্যিক চাকচিক্যময় অলঙ্করণে নয়…
যেমনটা সকল উৎকৃষ্ট পণ্যের হওয়া উচিত।
এটি এমনকি ঘড়িটার জন্যও প্রয়োজনীয় ছিল।
সে এটি দেখতে না দেখতেই মনে করল, এটি অবশ্যই জিমের জন্য। এটা তাঁর মতো।
বর্ণাধিক্যহীন এবং মূল্যবান…
দুটি বিশেষণই এর জন্য প্রযোজ্য। তাঁর
কাছে থেকে তারা এটির জন্য একুশ ডলার নিল
এবং সাতাশি সেন্ট
নিয়ে সে তাড়াতাড়ি করে বাড়িতে ফিরল। কেউ সঙ্গে থাকলে, ঘড়ির সেই
পুরোনো চেইনের কারনে জিম অবশ্য
পুরোপুরি চিন্তিত থাকত সময় দেখার
ব্যপারে। ঘড়িটার মতই দেখতে মস্ত বড়,
চেইনের পরিবর্তে পুরোনো চামড়ার
ফিতা ব্যবহার করায়, জিম মাঝে মাঝে ঘড়িটা গোপনে দেখত। ডেলা বাড়িতে ফিরলে, তাঁর
উন্মত্ততা কিছুটা পরিণামদর্শিতা ও কারণ
বিশ্লেষণের অবসর পেল। সে তাঁর ইস্পাতের
চুল ছাটাইয়ের কাচি বের করে গ্যাসের
বাতি জ্বালালো, এর পর, তাঁর ভালোবাসায়
অসীম মহত্ব যোগ করতে যেয়ে যে ধ্বংসস্তুপ সৃষ্টি হয়েছিল, সেটা মেরামতের কাজ
চালিয়ে গেল। প্রিয় বন্ধুরা, এটা সব সময়ই
একটা সুমহৎ কাজ….একটি মস্ত বড় কাজ। চল্লিশ মিনিটের মধ্যে তাঁর
মাথা অতি ক্ষুদ্র, ঠিক
অনেকটা কোঁকড়ানো চুলের মত
গুচ্ছে ঢেকে গেল, চমৎকার দেখাচ্ছিল
তাঁকে যেন সে একজন নিয়মিত স্কুল
পালানো বালক। সে আয়নায় তাঁর প্রতিবিম্বের দিকে সময় নিয়ে, যত্নের
সাথে এবং সমালোচনার দৃষ্টিতে তাঁকালো। “যদি জিম আমাকে হত্যা না করে”,
সে নিজেকেই বলল, “আমার দিকে তাঁকানোর
আগে সে এক সেকেন্ড সময় নেবে, এর পর বলবে,
তোমাকে কনি দ্বীপের গীতিনাট্যের
বালিকাদলের বালিকার মত লাগছে। কিন্তু
কি করতে পারতাম আমি…আহা! এক ডলার সাতাশি সেন্ট নিয়ে কি করতে পারতাম
আমি?” সাতটার সময় কফি বানানো হল। মাছ ভাঁজার
কড়াই গরম চুলোর উপর রেখে চপ বানানোর
জন্য প্রস্তুত করা হল। জিমের ফিরতে কখনো দেরি হয় না।
ডেলা ঘড়ির চেইনটি হাতে নিয়ে দুই ভাঁজ
করে দড়জার কাছে টেবিলের এক কোণে বসল,
যেখান দিয়ে দিয়ে সে সব সময় প্রবেশ
করেন। এরপরে, সিঁড়িতে সে তাঁর প্রথম বার
পা ফেলার আওয়াজ পেয়ে কিছু মুহূর্তের জন্য ফ্যাকাশে হয়ে গেলেন। প্রতিদিনের
সাদামাটা বিষয়গুলো নিয়ে তাঁর ছোট নীরব
প্রার্থনা পড়ার অভ্যাস ছিল, এবং এখন
সে ফিসফিস করে প্রার্থনা করল,
“দয়া কর,ইশ্বর, সে যেন
ভাবে আমি দেখতে এখনো সুন্দর।” দড়জা খুলে গেল, জিম প্রবেশ করে এটি বন্ধ
করল। তাঁকে কৃশকায় ও খুব গম্ভীর দেখাচ্ছিল।
দুর্বল মানুষ, বয়স মাত্র বাইশ …
একটি পরিবারের ভার বয়ে ভারাক্রান্ত!
তাঁর একটি নতুন ওভারকোটের প্রয়োজন,
কোনো দাস্তানা নেই। জিম দড়জার দিকে কয়েক পা পিছিয়ে গেলেন,
নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন,
যেভাবে একটি দীর্ঘ লোমওয়ালা সেটের
জাতের কুকুর তিতিরের গন্ধ পেলে নিশ্চল
হয়ে যায়। তাঁর চোখ দুটি ডেলার উপরে স্থির
হয়ে আছে, সেখানে এমন একটি অভিব্যক্তি যা ডেলা পড়তে পারছে না,
এতে সে ভীত হয়ে পড়ছে। এটা রাগ নয়, নয়
বিস্ময়, নয় অননুমোদন, নয় আতঙ্ক, নয় এমন
ধরণের অনুভূতির অভিব্যক্তি যার জন্য
ডেলা প্রস্তুত ছিল। মুখে সেই বিচিত্র
অভিব্যক্তি নিয়ে, সে সহজাতভাবে স্থির দৃষ্টি নিয়ে ডেলার দিকে তাঁকিয়ে আছে। ডেলা কাঁচুমাঁচু করে টেবিল থেকে উঠে তাঁর
দিকে এগিয়ে গেল।
“জিম, প্রিয়তম”, সে কেঁদে উঠল, “আমার
দিকে এভাবে তাঁকিও না। আমি আমার চুল
কাটিয়েছি এবং সেগুলো বিক্রি করে দিয়েছি কারন
ক্রিসমাসের ভিতর তোমাকে কোনো উপহার না দিয়ে আমি থাকতে পারবো না।
এগুলো আবার বড় হয়ে উঠবে…তুমি কিছু মনে কর
না, করবে কি? এছাড়া আর কোনো উপায় ছিল
না আমার। আমার চুল ভয়ানক দ্রুত বেড়ে উঠে।
বল,’মেরি ক্রিসমাস!’ জিম, চল আমরা আনন্দ
করি। তুমি জাননা কতটা চমৎকার – কতটা সুন্দর, চমৎকার উপহার তোমার জন্য
আমি এনেছি”। “তুমি তোমার চুল কাটিয়েছো?”, অনেক কষ্ট
করে, জিম জিজ্ঞেস করে, যেন
বাস্তবিকপক্ষেই এখনো স্পষ্ট ধারনায়
পৌছতে পারছে না, এমন কি কঠিনতম মানসিক
পরিশ্রমের পরও। “কাটিয়েছি এবং এগুলো বিক্রি করে দিয়েছি”,
ডেলা বলল। “তুমি কি আমাকে এভাবে পছন্দ
করছ না, কোনোভাবেই? আমার চুল গেলেও
আমিই তো আছি, আমি নেই?” জিম উৎসুকভাবে কক্ষের চারিদিকে তাঁকালো।
“তুমি বলছ তোমার চুল গেছে?”, প্রায় চরম
নির্বোধোচিত হয়ে সে বলল।
“এটি খুঁজে আর কাজ নেই তোমার”, ডেলা বলল,
“এটি বিক্রি হয়ে গেছে,
আমি তোমাকে বলছি… বিক্রি হয়েছে, চলেও গিয়েছে। বোকাছেলে, এটা ক্রিসমাস ইভ।
আমার দিকে ভালো করে তাঁকাও, এর জন্যই
তোমাকে দিতে পেরেছি। সম্ভবত আমার
মাথার চুল কমে গিয়েছিল”, সে হঠাৎকরেই
গভীর মিষ্টি সুরে বলে চলল, “কিন্তু কেউ
কখনো গুনে দেখতে পারবে না কতটা ভালোবাসা রাখা আছে তোমার জন্য। আমি কি তোমার জন্য চপ সাঁজাবো,
জিম?” এই অস্বাভাবিক মোহগ্রস্ত অবস্থার
বাইরে জিমকে মন হল দ্রুত জেগে উঠছে।
সে তাঁর ডেলাকে জড়িয়ে ধরল। দশ সেকেন্ড
ধরে আসুন আমরা অন্য ক্ষেত্রের কিছু
অগুরুরত্বপূর্ণ বিষয়ে সতর্ক নীরিক্ষার
সাথে মনোযোগ দেই। এক সপ্তাহে আট ডলার কিংবা বছরে দশ লক্ষ ডলার…
পার্থক্যটা কোথায়? এক জন গনিতবিদ
বা একজন আইনজ্ঞ আপনাকে ভুল উত্তরটি দিবে।
মেজাইয়েরা অনেক উপহার নিয়ে আসে, কিন্তু
সেগুলো অর্থের মধ্যে নেই। কিছু পরেই এ দৃঢ়
অন্ধ উক্তি আলোকিত হয়ে উঠবে। জিম তাঁর ওভারকোটের ভিতর
থেকে একটি পার্সেল বের করে টেবিলের উপর
ছুড়ে মারল। “কোনো ভুল করো না, ডেল”, সে বলল, “আমার
ক্ষেত্রে, আমি মনে করি না কোনো হেয়ারকাট,
শেভ বা শ্যাম্পু আমার বউয়ের প্রতি আমার
ভালোবাসা একটুও কমাতে পারবে। কিন্তু
যদি তুমি পার্সেলটি খুলে দেখো,
তুমি বুঝতে পারবে কেন একটু আগে আমাকে অমন করতে দেখে ছিলে?”
ফর্সা আঙুলগুলো ক্ষিপ্র গতিতে সুতো এবং কাগজ
ছিড়ে ফেলল। একটি পরম আনন্দিত চিৎকার
এবং এর পরে, আহা! খুব দ্রুত নারীসুলভ
পরিবর্তিত উন্মত্ত চোখের জল এবং বিলাপ,
ইশ্বরের সান্তনা দানের সকল ক্ষমতার তাৎক্ষনিক প্রয়োগ এই ফ্ল্যাটে প্রয়োজনীয়
হয়ে পড়েছে। এটি ছিল চিরুনি…চিরুনির সেট, পার্শ্বে ও
পিছনে দাঁত, যার কামনায় ডেলা দীর্ঘ দিন
ধরে দোকানের জানালায় চেয়ে থেকেছে।
চমৎকার চিরুনি, কচ্ছপের খাঁটি খোলকের
সাথে অলঙ্করিত বাঁট… সুন্দর সুশোভিত কেশের
পরিধেয় ছায়া। সে জানত চিরুনিগুলো খুব দামী এবং কোনো আশা নেই জেনেও
এগুলো পাবার জন্য তাঁর হৃদয়ে ছিল ব্যাকুল
কামনা ও বাসনা। এখন এগুলো তাঁর আছে, কিন্তু
যে দীর্ঘ কেশ সাঁজানোর জন্য এটি প্রয়োজন
ছিল, সেই প্রবল কামনার ধন হারিয়ে গেছে। কিন্তু সে এগুলোকে তাঁর বুকের
মাঝে জড়িয়ে ধরল,
অবশেষে সে ঝাপসা চোখে তাঁকাতে পারল
এবং মৃদু হেসে বলল, “আমার চুল খুব দ্রুত বাড়ে,
জিম!” এর পর ডেলা ছ্যাঁকা খাওয়া ছোট বিড়ালের
মত লাফিয়ে কেঁদে উঠল, “আহা, আহা!” জিম তাঁর সুন্দর উপহারটি এখনো দেখে নি।
ডেলা তাঁর হাতের
খোলা তালুতে এটি রেখে জিমের
সামনে মেলে ধরল। তাঁর উজ্জ্বল ও অতিশয়
আকুল আত্নার প্রতিফলিত আলোর ছটায়
মনে হচ্ছিল অনুজ্জ্বল মূল্যবান ধাতুটি চমকে উঠবে। “এটা কি খুব চমৎকার নয়, জিম?
এটি খুঁজে পেতে আমি সারা শহর
চষে বেড়িয়েছি। এখন তোমাকে সময়
দেখতে যেয়ে প্রতিদিন এটিকে একশ বার
দেখতে হবে। তোমার ঘড়িটি আমাকে দাও।
তোমার ঘড়িতে এটি কেমন দেখায় আমি দেখতে চাই”। ডেলার অনুরোধ না রেখে, জিম হুড়মুড়
করে গদিওয়ালা চেয়ারটায় বসে পড়ল
এবং মাথার নিচে হাত দুটি রেখে মৃদু হাসল। “ডেল”, সে বল, “চল আমাদের ক্রিসমাসের
উপহারগুলোকে সাঁজিয়ে রাখি। এখন এগুলোর
ব্যবহার খুব একটা প্রীতিকর নয়। তোমার
চিরুনি কেনার টাকা যোগার
করতে যেয়ে আমি ঘড়িটি বিক্রি করে দিয়েছি।
মনে কর, এখন তোমাকে চপগুলো সাঁজাতে হবে”। আপনারা জানেন, মেজাইয়েরা জ্ঞানি মানুষ
ছিলেন…বিস্ময়কর রকম
জ্ঞানি মানুষ..যারা গোশালার শিশুর জন্য
উপহার নিয়ে এসেছিলেন। ক্রিসমাসে উপহার
প্রদান কৌশল তাঁরা আবিষ্কার করেন।
তাঁরা জ্ঞানী হওয়ায়, নিঃসন্দেহে তাঁদের দেওয়া উপহারও জ্ঞানগর্ভ, দুটো একই বস্তুর
ক্ষেত্রে এটি বিনিময়ের সম্ভাব্য সুযোগ
প্রদান করে।
এখানে আমি অছিলা আকারে আপনাদের
সাথে সম্পর্যুক্ত হয়েছি এমন একটি বিরল
ঘটনাপঞ্জীতে যেখানে একটি ফ্ল্যাটের দুই বোকা শিশু তাঁদের বাড়ীর সর্বাধিক মূল্যবান
সম্পদ সর্বাধিক অজ্ঞানীভাবে একে অপরের
জন্য উৎসর্গ করেছে। কিন্তু আজকের দিনের
জ্ঞানীরা শেষ কথা হিসেবে এটাই বলবে,
যারা উপহার দিয়েছে তাঁদের মধ্যে এই
দুইজনই সবেচেয়ে জ্ঞানী। যারা উপহার দিয়েছে এবং পেয়েছে, তাঁদের সকলের
মধ্যে এরাই সবচেয়ে জ্ঞানী। সবক্ষেত্রেই
তাঁরা সবচেয়ে জ্ঞানী। তাঁরাই মেজাই।
Read More...

Friday, August 17, 2012

ও হেনরীর ছোট গল্প – বিশ বছর পরে

Leave a Comment
পেশাগত গাম্ভীর্য নিয়ে পুলিশ
অফিসারটি তাঁর টহল
পথে পা ফেলে এগিয়ে চলেছে।
মানুষকে দেখানোর জন্য নয়, এই
গাম্ভীর্যটা তাঁর অভ্যেস,
কেননা আশেপাশে দেখবার মতো তেমন কেউ ছিল না। সময় বেশি হয় নি, বড় জোর রাত
দশটা, কিন্তু তীব্র আকস্মিক ঝড়ো হাওয়া আর
হালকা বৃষ্টির জন্য রাস্তাটা জনশূণ্য
হয়ে পড়েছে। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এক একটা দরজা পরখ
করে দেখছিল সে, কখনো কখনো তাঁর হাতের
লাঠিটি দুর্বোধ্য ও বেয়াড়াভাবে আন্দোলিত
হচ্ছিল, ইতস্ততভাবে ঘাড় ফিরিয়ে সতর্ক
দৃষ্টিতে দেখছলি প্রশান্ত রাজপথকে,
তিনি অফিসার, তাঁর স্থিরপ্রতিজ্ঞ মূর্তি ও মৃদু হামবড়াভাব সব মিলিয়ে শান্তির
দেবদূতের সুন্দর একটা প্রতিচ্ছবি যেন
ফুটে উঠেছে। মাঝে মাঝে দুই একটা চুরুট
স্টোর বা সারা রাত্রী খোলা খাবারের
দোকানের আলো চোখে পড়ে, কিন্তু অনেক আগেই
বন্ধ হয়ে গেছে অধিকাংশ ব্যবসা- প্রতিষ্ঠানের দড়জা। নির্দিষ্ট এক জায়গার মাঝামাঝি এসে হঠাৎ
হাঁটার গতি কমিয়ে আনল পুলিশ অফিসারটি।
অন্ধকার হয়ে আসা এক হার্ডওয়্যার স্টোরের
দরজায় হেলান
দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা লোক, তাঁর ঠোঁটের
ফাঁকে গুঁজে রাখা চুরুটটায় এখনো আগুন ধরানো হয় নি। পুলিশ অফিসারটি তাঁর দিকে হেঁটে আসতেই
লোকটি দ্রুত কথা বলে উঠল, “ঠিক
আছে অফিসার”। লোকটি তাঁকে পুনঃআশ্বাস
দিয়ে বলল, “আমি ঠিক আমার এক বন্ধুর জন্য
অপেক্ষা করছি। এখানে আজকের এই
দেখা করার সময়টা ঠিক হয়েছিল বিশ বছর আগে। কথাটি আপনার কাছে কিছুটা অদ্ভুত
শুনাচ্ছে, তাই না? ঠিক আছে,
আপনি শুনতে চাইলে আমি ব্যাপারটি খোলাসা করে বলতে পারি।
অনেক কাল আগে ঠিক এই স্টোরটার জায়গায়
একটা রেস্তোরাঁ ছিল—‘বিগ জো’ ব্র্যাডির
রেস্তোরাঁ।” “পাঁচ বছর আগেও ছিল”, পুলিশ
অফিসারটি বলল, “এর পর এটি উঠে যায়”। দরজায় হেলান দেওয়া লোকটি দেয়াশেলাই
ঠুকে তাঁর চুরুটটা ধরাল। দেয়াশেলাইয়ের
আলোয় দেখা গেল এক ফ্যাকাশে মুখ,
লম্বা চওড়া চিবুক, উৎসুক এক জোড়া চোখ আর
ডান চোখের ভুরুর
কাছাকাছি একটা সাদাটে ছোট কাটা দাগ। তাঁর স্কার্ফের
পিনে অদ্ভুতভাবে বসানো একটা বড় আকারের
হিরে। “বিশ বছর আগে আজকের এই রাতে”,
লোকটি বলে চলল, “এখানে ‘বিগ জো’
ব্র্যাডির রেস্তোরাঁয় এই পৃথিবীতে আমার
সবচেয়ে অন্তরঙ্গ বন্ধু, সবচেয়ে কাছের মানুষ
জিমি ওয়েলসের সাথে রাতের খাবার
খেয়েছিলাম। ও আর আমি এই নিউইয়র্ক শহরে আপন দুই ভাইয়ের মতো এক সাথে বড়
হয়েছি। আমার বয়স তখন আঠার আর জিমির
বিশ। পরের দিন সকালে ভাগ্য গড়তে আমার
পশ্চিমের দিকে বেরিয়ে পরার কথা ছিল।
জিমিকে কিছুতেই আপনি কখনো নিউইয়র্কের
বাইরে নিয়ে যেতে পারবেন না; ওর ধারনা পৃথিবীতে এই একমাত্র জায়গা।
যা বলছিলাম, সেদিন আমরা দুই জন একমত
হয়েছিলাম বিশ বছর পরে আমরা আবার
এখানে দেখা করব ঠিক এই তারিখ ও এই
সময়ে, আমাদের অবস্থা যাই হোক না কেন, আর
যত দূরেই আমরা থাকি না কেন। ধরে নিয়েছিলাম, এই বিশ
বছরে আমরা আমাদের
লক্ষ্যে পৌছে যেতে পারব আর আমাদের ভাগ্যও
নির্ধারিত হয়ে যাবে, যেভাবে হওয়ার
কথা ছিল”। “খুব আকর্ষণীয় ব্যাপার মনে হচ্ছে”, পুলিশ
অফিসার বলল। “দু-বারের দেখা হবার মাঝের
সময়টা অনেক লম্বা বলে মনে হচ্ছে আমার
কাছে। আপনি চলে যাওয়ার পর বন্ধুর
কোনো খোঁজ-খবর আর পান নি?”
“জ্বি, হ্যা, বেশ কিছুদিন আমরা একে অপরের সাথে চিঠিপত্র আদান প্রদান করেছি”,
লোকটি বলল। “কিন্তু দুই এক বছর
পরে আমাদের একে অপরের সাথে যোগাযোগ
বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আপনি হয়ত জানেন,
পশ্চিম অনেক বড় জায়গা, আর
সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য আমাকেও অনেক ঠেলাঠেলি করতে হয়েছে। কিন্তু
আমি জিমিকে চিনি, ও
যদি বেঁচে থাকে অবশ্যই আমার
সাথে দেখা করতে আসবে এখানে, কারন ও ছিল
পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে খাঁটি মানুষ আর
সবচেয়ে বিশ্বস্ত পুরনো বন্ধু। ও ভুলে যাবে না কখনো। আমি হাজার হাজার
মাইল পথ পাড়ি দিয়ে আজ রাতে এই দরজার
সামনে এসে দাঁড়িয়েছি, আমার পুরনো বন্ধু
যদি আসে তবেই সেটা সার্থক হবে”। ঢাকনার ওপর ছোট ছোট হিরের
টুকরো বসানো একটি সুদৃশ্য ঘড়ি পকেট
থেকে বের করল অপেক্ষারত লোকটি। “দশটা বাজতে তিন মিনিট বাকি”,
ঘড়ি দেখে বলল লোকটি। “ঠিক দশটায়
আমরা সেদিন রেস্তোরাঁর দরজা থেকে বিদায়
নিয়েছিলাম”।
“পশ্চিমে যেয়ে ভালোই লাভবান হয়েছেন,
তাই না?”, পুলিশ অফিসার জানতে চাইলো। “আপনি ঠিক বলেছেন! আশা করছি, জিমি এর
অর্ধেক হলেও জুটিয়েছে। ও খুব ভালো লোক,
ধীরে ধীরে ক্রমাগত কাজ
করে নিরবে এগিয়ে যাওয়া ওর পছন্দ।
প্রতিষ্ঠা পেতে আমাকে পাল্লা দিতে হয়েছে কিছু
তীক্ষ্ণতর বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের সাথে। নিউইয়র্ক শহর একজন মানুষকে এক
ঘেয়ে জীবনরীতিতে অভ্যস্ত করে তোলে, আর
পশ্চিম তাঁর জীবনকে করে ক্ষুরধার”। পুলিশ অফিসার তাঁর
লাঠিটি মোচড়াতে মোচড়াতে দুই এক
পা সামনে এগিয়ে বলল,
“আমাকে কাজে যেতে হচ্ছে। আশা করছি,
আপনার বন্ধু সময় মতো চলে আসবে। তাঁর
সাথে দেখা হবার পরেই কি চলে যাচ্ছেন?” “না না!”, “আমি ওকে কম করে হলেও
আধা ঘন্টা সময় দেব।
যদি জিমি পৃথিবীতে বেঁচেবর্তে থাকে,
তবে ও ঠিক সময়েই এখানে হাজির হবে।
ভালো থাকবেন, অফিসার”। “শুভ রাত্রী, স্যার”, লোকটিকে বিদায়
জানিয়ে পুলিশ অফিসার তাঁর টহল পথের
দরজাগুলো পরীক্ষা করতে করতে এগিয়ে যায়। ততক্ষনে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে আর হঠাৎ
হঠাৎ আসা বাতাস একটানা সজোরে বইতে শুরু
করেছে। যে কয়েকজন পথচারী তখনো রাস্তায়
ছিল, কোটের কলার উচু করে হাত
পকেটে ঢুকিয়ে নিরবে দ্রুত
হেঁটে চলে যাচ্ছিল। আর হার্ডওয়্যার স্টোরের দরজায় দাঁড়িয়ে যে লোকটি হাজার
হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে তাঁর
তরুন বয়সের ফেলে আসা বন্ধুটির
সাথে কথা দেয়া অনিশ্চিত, প্রায় উদ্ভট
সাক্ষাৎকার বজায় রাখতে, চুরুটের
ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে অপেক্ষা করে চলল সে। প্রায় বিশ মিনিট অপেক্ষার পর, এক লম্বামত
লোক লম্বা ওভারকোট গায়ে চাপিয়ে কান
পর্যন্ত কলার টেনে দিয়ে রাস্তার অপর পার
থেকে দ্রুত তাঁর দিকে এগিয়ে এল। “তুমি বব?”, অনেকটা সন্দেহ
নিয়ে জানতে চাইলো লোকটি।
“তুমি জিমি ওয়েলস?”, দরজায়
দাঁড়ানো লোকটি চিৎকার করে কেঁদে উঠল। “আহা শান্তি!” নবাগত
বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠল, উভয়েই
ততক্ষনে পরস্পরের হাত মুঠোয় ধরে রেখেছে।
“আমার বিশ্বাস ছিল, তুমিই বব।
আমি নিশ্চিত ছিলাম,
যদি তুমি এখনো বেঁচে থাকো আমি তোমাকে এখানেই খুঁজে পাবো। ভালো, ভালো, খুব ভালো— বিশ
বছর অনেক লম্বা সময়।
পুরনো রেস্তোরাঁটা উঠে গেছে বব;
যদি ওটা থাকত, তবে এখানে আরেকবার
একসাথে রাতের খাবারটা সারা যেত।
পশ্চিমে তোমার কেমন কাটল, আমার বুড়ো বন্ধু?”
“খাসা! সব পেয়েছি আমি যা চেয়েছিলাম।
তুমি অনেক বদলে গেছ, জিমি। আমি কখনোই
ভাবি নি তুমি আরও দুই তিন
ইঞ্চি লম্বা হয়ে যাবে”।
“ওহ! বছর বিশের পরে আরও কিছুটা বেড়েছি”।
“নিউইয়র্কে ভালোই চলছে, জিমি?”
“মুটামুটি। শহরের
সরকারী একটা দপ্তরে কাজ করি। চল, বব;
আমার পরিচিত একটা যায়গায় গিয়ে অনেক
সময় ধরে পুরনো দিনের সব গল্প করা যাবে”। হাত ধরাধরি করে রাস্তা ধরে এগোল দুই জন।
পশ্চিম থেকে আসা লোকটি, সাফল্য
পেয়ে আত্নপ্রচারে মেতে উঠেছিল যে,
সে তাঁর পেশাজীবনের ইতিহাস বলা শুরু করল
একে একে।
ওভারকোটে ঢেকে যাওয়া লোকটি আগ্রহসহকারে খুব মনোযোগের সাথে শুনে যাচ্ছিল। গলির এক
কোনায় ছিল একটা ঔষুধের দোকান, যেখানটায়
জ্বলছিল উজ্বল বৈদ্যুতিক বাতিগুলো। এই
আলোতে এসে দুই জন একসাথে একে অপরের
দিকে মুখ ফিরে তাকালো। পশ্চিম
থেকে আসা লোকটি হঠাৎ থেমে গিয়ে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল। “তুমি জিমি ওয়েলস নও”, দাঁতে দাঁত
কামড়ে বলল লোকটা। “বিশ বছর অনেক দীর্ঘ
সময়, কিন্তু এত দীর্ঘ সময় নয় যেখানে এক
জনের রোমান ধাঁচের নাক বদলে বোঁচা নাক
হয়ে যায়”। “সময় কখনো কখনো একজন
ভালো মানুষকে খারাপ মানুষে বদলে দেয়”,
লম্বা লোকটি বলে চলল, “আপনি দশ মিনিট
ধরে গ্রেপ্তার হয়ে আছেন, ‘সরল’ বব।
শিকাগো পুলিশ ধারণা করেছিল
আপনি এদিকটায় আসবেন, তাই ওরা টেলিগ্রাম পাঠিয়ে জানিয়েছিল, আপনার সাথে আলাপ
করতে চায়। শান্তভাবেই যাবেন, যাবেন কি?
এটাই শুভবুদ্ধির পরিচয় হবে। এখন, পুলিশ
স্টেশনে রওনা দেবার আগে আপনাকে এই
চিঠিটা দিতে বলা হয়েছে আমাকে।
আপনি চিঠিটি এই জানালার সামনে দাঁড়িয়ে পড়তে পারেন। এটি টহল
পুলিশ অফিসার ওয়েলস পাঠিয়েছে”।
পশ্চিম
থেকে আসা লোকটি তাঁকে দেওয়া কাগজের
টুকরোটির ভাঁজ খুলল। যখন চিঠিটি পড়তে শুরু
করল লোকটি, তখনও তাঁর হাতটি স্থির ছিল, কিন্তু চিঠিটি পড়ে শেষ করার পরই তাঁর হাত
মৃদুভাবে কাঁপতে লাগল। চিঠিটায় অল্প কিছু
কথা লেখা ছিল। “বব,
আমি ঠিক সময়েই দেখা করার স্থানে হাজির
হয়েছিলাম। চুরুট ধরানোর জন্য যখন
দেয়াশেলাই জ্বালালে, তখনই আমি দেখলাম
তোমাকে, এই মুখের এক জনকে শিকাগো পুলিশ
খুঁজছিল। যাই হোক, কাজটা নিজের হাতে করতে পারলাম না, তাই
আমি ফিরে এসে সাদা পোষাকের
একজনকে পাঠালাম দায়িত্বটা সম্পন্ন করতে।
জিমি”
Read More...

Thursday, July 12, 2012

ভুতুড়ে ঘড়ি

Leave a Comment
আমাদের গ্রামে একটা বড় বাগানবাড়ি আছে।
মুখার্জিবাড়ি।
তবে লোকে ওটাকে বলে পোড়াবাড়ি। বছর
ত্রিশ-চল্লিশ আগে এই
বাড়িতে মুখার্জি পরিবারের সব সদস্য
আগুনে পুড়ে মারা যায়। সেই থেকে এটার নাম পোড়াবাড়ি। এলাকায়
এটা ভুতুড়ে বাড়ি নামেও পরিচিত।
পরিচিতির কারণ, এ বাড়িতে আছে একটি বড়
দেয়ালঘড়ি। আগুনে সবকিছু পুড়ে গেলেও কোন
এক রহস্যময় কারণে এই ঘড়িটি পোড়েনি।
অনেকে নাকি রাতে এই ঘড়ির ঢং ঢং আওয়াজও শুনেছে। তাই রাতে তো বটেই, বিকেলের পর
ওদিকের পথ আর কেউ মাড়ায় না। একদিন
বন্ধুদের সঙ্গেবসে মাঠে আড্ডা দিচ্ছি, হঠাৎ
নরেন বলল, জানিস, গতকাল বিকেলে ওই
পোড়াবাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমিও
ওই ঘড়ির ঘণ্টার আওয়াজ শুনতে পেয়েছি। আমি বললাম, যা যা, গুল মারিস না। তেল নেই,
চাবি নেই, ওই ঘড়ি চলছে কি না তারও ঠিক
নেই, আর উনি ঘণ্টার আওয়াজ শুনেছেন!
আরে গিয়ে দেখ, এত দিনে হয়তো নষ্ট
হয়ে পড়ে আছে। নরেন বলল,
তাহলে কি আমি তোদের মিথ্যা বলছি? আমি বললাম, তোর মতো ভীতু
কি মিথ্যা ছাড়া সত্য কথা কখনো বলবে?
নরেন রেগে বলল, তা তুই তো খুব সাহসী,
যা না, গিয়ে পোড়াবাড়িতে ঘড়িটার
সঙ্গে একটি রাত কাটিয়ে আয়। নরেনের
সঙ্গে এবার সবাই যোগ দিল, হ্যাঁ, ঠিকই তো। যা, গিয়ে থেকে আয়। বন্ধুমহলে আমি একটু
সাহসী হিসেবেই পরিচিত, তাই তাচ্ছিল্যের
স্বরে বললাম, হ্যাঁ, থাকবই তো।
তবে থাকতে পারলে তোরা আমাকে কী দিবি ?
সাগর বলল, তোকে আমরা এক হাজার
টাকা দেব। তবে তুই যদি হেরে যাস তাহলে তুই আমাদের এক হাজার টাকা দিবি,
রাজি? বেশ, আমি রাজি। সে রাতেই
আমি পোড়াবাড়ির দিকে রওনা হলাম,
সঙ্গে নিলাম পাঁচ ব্যাটারির টর্চ, কম্বল,
বালিশ, দুটো মোম, ম্যাচ আর একটা ছোট ছুরি।
অমাবস্যার রাত। বলা তো যায় না কী হয়। তাই আর ঝুঁকি নিলাম না। পোড়াবাড়ির
জলসাঘরের ঘড়িটার সামনে আমি আমার
বিছানা পাতলাম। মোম দুটি ধরিয়ে দিলাম।
কিন্তু তাতে অন্ধকার কাটল
বলে মনে হলো না। ঘড়ির দিকে একপলক
তাকালাম, নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। এই ঘড়ি নাকি ঘণ্টা পেটায়—ভাবতেই
হাসি পেল। রাত যেন কাটছে না।
হাতঘড়িতে রাত ১২টা বাজার শব্দ
শুনতে পেলাম। সঙ্গে সঙ্গে আমার
মোমবাতি দুটো নিভে গেল।
অন্ধকারে ঢেকে গেল পুরোঘর। ঢং-ঢং- ঢং। একি! এ যে ঘণ্টা পেটার আওয়াজ! কিন্তু
ঘড়িটা তো নষ্ট! তবে কী…
হাতড়ে হাতড়ে টর্চটা অন করলাম।
জ্বলছে না কেন? ঘড়ির ঘণ্টার শব্দ যেন
আমার বুকে আঘাত করছে। আমার শ্বাস নিতেও
কষ্ট হচ্ছে।এই শীতের রাতেও আমি ঘেমে গেলাম। বাইরে চাঁদ উঠেছে। আজ
না অমাবস্যা! অমাবস্যায় চাঁদ উঠল কী করে?
ভয়ে আমি বারবার কেঁপে উঠছি। এই
বাড়ি ছেড়ে পালাব, তারও উপায় নেই।
দরজা দুটো খুলছে না।
মনে মনে আল্লাহকে ডাকছি। একি! আমার বিছানা যে হাওয়ায় উড়ছে! বাঁচাও বাঁচাও
বলে কয়েকবার চিৎকার দিলাম। কেউ মনে হয়
তা শুনতেও পায়নি। হঠাৎ
দেখি ঘড়িটা আলোকিত হয়ে উঠল। ঘড়ির
উজ্জ্বল আলোয় পুরো ঘর আলোকিত হলো।
আস্তে আস্তে ঘড়িটা আমার দিকে এগিয়ে এল। ভৌতিক গলায় বলল, আমি নষ্ট? তেল নেই,
চাবি নেই, আমি চলব কী করে? তুই
আমাকে অপমান করেছিস। আর
যে আমাকে অপমান করে, তার শাস্তি মৃত্যু।
হা-হা-হা! হঠাৎ আমার বিছানাটা গায়েব
হয়ে গেল। আমি নিচে পড়ে যেতে লাগলাম। নিচে, আরও নিচে। সেখানে শুধুই অন্ধকার।
বিজয়, এই বিজয়, বিজয়! কী ঘুমরে বাবা!
কতক্ষণ থেকে ডাকছি, শুনতে পাস না? নরেন
বলল। দেখলাম অপু, সাগর ওরা সবাই
এসে ঘরে ঢুকেছে। আমি ভয়ে ভয়ে একবার
ঘড়িটার দিকে তাকালাম। ঘড়িটা যেমন ছিল তেমনই আছে। তবে কি সারা রাত আমি স্বপ্ন
দেখছিলাম? পরিশিষ্ট: বন্ধুদের অনেক সাধাসাধির পরও
আমি বাজির টাকা নিলাম না। সাগর বলল, তুই
তো পোড়াবাড়িতে থাকতে ভয় পাসনি,
তাহলে টাকা নিবি না কেন? আমি ভয়
পেয়েছি কি পাইনি, তা তো আর আমার
চেয়ে ভালো কেউ জানে না। মনে মনে বললাম আমি।
Read More...

Wednesday, July 11, 2012

একটি জিলাপির প্যাচ টাইপের গল্প

Leave a Comment

শুরু হল যেভাবে...............
অফিসের বস সেক্রেটারি স্বর্ণাকে ডেকে বলল, আমি ১ সপ্তাহের জন্য অফিস ট্যুরে সিংগাপুর যাচ্ছি। ঠিক করেছি তোমাকেও সাথে নিয়ে যাব... !! Lets enjoy... :)

স্বর্ণা তার স্বামী রোমেলকে ফোনে বলল, রোমেল আমি ১ সপ্তাহের জন্য অফিসের কাজে সিংগাপুর যাব, তুমি ভাল ভাবে থেকো !

রোমেল তার গার্লফ্রেন্ড রিয়াকে ফোন করে বলল, আমার স্ত্রী দেশের বাহিরে যাচ্ছে, বাসা খালি... তুমি এক সপ্তাহের জন্য চলে এসো.... !! Lets enjoy... :)

রিয়া তার ছাত্র পার্থকে ফোন করে বলল, আমি এক সপ্তাহ busy থাকব, তোমার এই সপ্তাহ ছুটি। তুমি enjoy কর !! :)

পার্থ তার বাবাকে ফোন করে বলল, বাবা ! কাল থেকে আমার প্রাইভেট সাতদিনের জন্য বন্ধ। তুমি এই সাতদিন কোথাও যেতে পারবেনা... তোমার সাথে অনেক মজা করব !!

ছেলের ফোন পেয়ে বাবা অফিসের সেক্রেটারিকে বলল, স্বর্ণা, আমার আরো একটি important কাজ এসেছে, এই সপ্তাহে সিংগাপুর যাওয়া হবে না। Tour cancel... !!

স্বর্ণা তার স্বামী রোমেলকে ফোনে তখনই বলল, আমি কোথাও যাচ্ছি না। Tour cancel হয়েছে। তোমার আর একা একা থাকতে হবে না। :)

রোমেল তার গার্লফ্রেন্ড রিয়াকে সঙ্গে সঙ্গে ফোন করে বলল, এই শুনো, আমার স্ত্রী কোথাও যাচ্ছে না তাই তোমার আর কষ্ট করে আসতে হবে না !!

তাই শুনে রিয়া তার ছা্ত্র পার্থকে ফোন করে বলল, আমার যেই কাজ ছিল সেটা আর করতে হচ্ছে না, তাই তুমি কাল সকাল থেকে যথারীতি পড়তে আসবে !!

পার্থ তৎক্ষনাৎ তার বাবাকে ফোন করে বলল, বাবা আমি এই সপ্তাহে আর ফ্রি হতে পারলাম না ! কারণ প্রাইভেট ম্যাডাম যেতে বলেছে। সামনে পরীক্ষা, অনেক পড়তে হবে !!

সাথে সাথে পার্থর বাবা স্বর্ণাকে ফোন করে বলল, আমার যে অন্য important কাজ ছিল সেটা তোমার জন্য cancel করেছি, চল কাল সিংগাপুর যাব ! আজই প্রস্তুত হয়ে নাও ! Lets enjoy... :)


চলতেই থাকবে...............
Read More...

Tuesday, July 3, 2012

↓নদী কত দূর¿

Leave a Comment

মূল : অজিত হরি সাহু
তরজমা : হোসেন মাহমুদ একটি বালক এবং নদীর মধ্যে দণ্ডায়মান ছিল
একটি পর্বত। বালকটির বয়স ছিল কম, নদীটি ছিল ছোট, কিন্তু পর্বতটি ছিল বিরাট। ঘন জঙ্গলে ঢাকা পর্বতটি নদীকে আড়াল
করে রেখেছিল। কিন্তু
বালকটি জানতো যে নদীটি সেখানে আছে এবং কোথায়
আছে, দেখতেই বা কেমন। সে নিজের
চোখে নদীটি দেখেনিÑ কিন্তু গ্রামের
মানুষদের কাছে নদীটির কথা সে এত বেশি শুনেছিল যে তার মনের ভেতর
একটি সুস্পষ্ট ছবি আঁকা হয়ে গিয়েছিল।
নদীতে মাছ আছে, পাথর আছে, স্রোত আছে আর
স্রোতের ঘূর্ণি আছে। আসলেই
নদীটি সম্পর্কে জানতে তার কিছুই বাকি ছিল
না শুধু বাকি ছিল নদীর পানি স্পর্শ করা এবং নিজের চোখে দেখা। পর্বতের বিপরীতে একটি পাহাড়ের ওপর
তাদের বাড়ি। বাড়ির
সামনে দাঁড়িয়ে সে উপত্যকার
দিকে তাকিয়ে নদীটির কথাই ভাবছিল। তার
বয়স প্রায় বারো বছর। বলিষ্ঠ শরীর, মাথায়
অবিন্যস্ত কালো চুল, দু’টি উজ্জ্বল কালো চোখ। চেহারা ভালো, গায়ের রঙ বাদামি।
তবে তার হাত ও পায়ের চামড়া ছিল রুক্ষ,
ফাটা। তার পা ছিল খালি। জুতো কেনার
সামর্থ্য তার ছিল না তা নয়।
আসলে খালি পায়ে থাকতেই সে স্বাচ্ছন্দ্য
বোধ করত। সরাসরি পাথরের উষ্ণতা ও ঘাসের শীতলতা অনুভব করতে তার ভালো লাগত।
যেহেতু সে জুতো পরত না তাই জুতো পরা ও
খোলার ঝামেলাও তার ছিল না। সকাল এগারোটা বেজে গিয়েছিল। বাবা-
মা কেউই আজ সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরবেন
না।
সাথে রুটি নিয়ে বেরিয়ে পড়া যেতে পারে,
সে ভাবল। পথে বুনো ফল-টল পাওয়া যাবে।
সেগুলো কিছু তুলে নেয়া যেতে পারে। অনেকদিন ধরেই এরকম একটি সুযোগের
অপেক্ষায় ছিল সে। এমন সুযোগ অনেকদিন আর
নাও আসতে পারে। বহুদিন পর বাবা-
মা জরুরি প্রয়োজনে সারাদিনের জন্য
আত্মীয়স্বজনের সাথে দেখা করতে গেছেন।
তাকে তারা একা রেখে গেছেন বাড়িতে। তার যাতে কোন অসুবিধা না হয় সে জন্য কিছু
খাবারও তৈরি করে রেখে গেছেন মা, যার
মধ্যে আছে রুটি, দুধ ও দু’টি ডিম।
সে যদি সন্ধ্যার মধ্যে তাদের ফেরার আগেই
বাড়ি ফিরে আসতে পারে তাহলে তারা কিছুই
টের পাবেন না। সে বাড়ির মধ্যে ফিরে আসে। একটি খবরের
কাগজের মধ্যে রুটি জড়িয়ে নেয়। তারপর সব
ঘরের দরজা ও জানালা ভালো করে বন্ধ করে।
আর দেরি করা ঠিক হবে না।
বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে সে। নদীতে যাবার পথটি প্রথমে কিছুদূর ঢালু
হয়ে উপত্যকায় নেমে গেছে, তারপর
উপরে উঠতে উঠতে ঘুর পথে বিরাট পর্বতের
ভেতর দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। কাঠুরে,
দুধওয়ালা, খচ্চর চালকসহ
গ্রামবাসীরা এপথে সবসময় চলাচল করে। তবে পর্বতের ওপারে বা নদীর কাছে কোন
গ্রাম নেই। পথে এক কাঠুরের সাথে বালকটির দেখা হয়।
নদীটা আর কতদূরেÑ জিজ্ঞেস করে সে।
কাঠুরে লোকটা বেঁটে, কিন্তু শক্তিশালী। তার
মুখের চামড়া বিবর্ণ ও ভাজপড়া। বোঝা যায়,
ঝড়-বৃষ্টি বরফের অত্যাচারেই এই অবস্থা।
তার প্রশ্নের জবাব দেয় কাঠুরিয়াÑ : সাত মাইল। ঠিকই বলেছে সে ভাবে। এ সময় কাঠুরে প্রশ্ন
করে : তুমি এটা জানতে চাইলে কেন? : আমি নদীটা দেখতে যাচ্ছি। : তুমি কি একা? : হ্যাঁ। : কিন্তু নদীতো অনেক দূরে।
সেখানে পৌঁছুতে আরো তিন
ঘণ্টা লেগে যাবে। তারপর তোমাকে আবার
ফিরতে হবে। তখন অন্ধকার হয়ে যাবে।
তাছাড়া পথ ভালো নয়। বালকটি কাঠুরেকে আশ্বস্ত করার জন্য বলে : আমি খুব ভাল হাঁটতে পারি। আসলে বাড়ি ছেড়ে হেঁটে এক মাইলের
বেশি দূরে কখনোই যায়নি সে। এটি ছিল
বাড়ি থেকে তার স্কুলের দূরত্ব। যাহোক,
সে দ্রুত চলতে শুরু করে।
এদিকে কাঠুরে বিস্মিত চোখে বালকটির
গমনপথের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। বাজার থেকে ফেরার পথে ছেলেটি ফিরল
কি না সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে
কাঠুরে মনে মনে ভাবে। বেশ ঢালু পথ। তাই বালকটিকে বেশিরভাগ
সময়ই দৌড়াতে হচ্ছিল।
আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ। এরকম পথে চলা সহজ
নয়। দু’বার
সে পা পিছলে গড়িয়ে পড়তে পড়তে রাস্তার
পাশে থাকা ঝোপে আটকে গেল। একবার পথ থেকে সরে বেশ খানিকটা নিচেও নেমে গেল
সে। বেশ কষ্টে আবার উপরে উঠে এলো। তবু
গোটা পথে পাহাড়ের অপরূপ সবুজ দৃশ্য মুগ্ধ
করে রাখল তাকে।
সারা পাহাড়কে ঢেকে রেখেছে ঘন সবুজ
ফার্ন, ছোট গাছগাছালি, তাদের গায়ে বেড়ে ওঠা লতাপাতা। এক জায়গায়
গাছের পাতা ও ফার্নের আবরণ
সরিয়ে মাথা তুলেছে বিশাল এক
সোনালি রঙের ডালিয়া। মনে হচ্ছে,
জায়গাটি আলোকিত হয়ে উঠেছে। শিগগিরই
সে উপত্যকায় নেমে এল। এখান থেকে পথ সোজা উপরে উঠে গেছে। এ সময় উল্টো দিক
থেকে আসা এক তরুণীর দেখা পেল সে। তার
হাতে একটি বাঁকা ছুরি যা ঘাস কাটার জন্য
ব্যবহার করা হয়। নাকে ও কানে রিং ঝুলছে।
দু’হাতে অনেক ভারী চুড়ি। বালকটি জিজ্ঞেস করে তরুণীকে, আচ্ছা,
নদীটা আর কত দূর? তরুণীটি নদীর কথা হয় জানেই না অথবা অন্য
কারো কথা ভাবছিল। তাই
অন্যমনস্কভাবে জবাব দিল : তা বিশ মাইল হবে। জবাব শুনে হেসে উঠল সে। তারপর চলতে শুরু
করল। হঠাৎ কোত্থেকে যেন
একটি তোতাপাখি উড়ে আসে। পাখিটি তার
মাথার ওপর দিয়ে উড়তে থাকেÑ যেন
তাকে সঙ্গ দিচ্ছে। চড়াই-এর পুরো পথটিই
তার সাথে সাথেই রইল পাখিটা। তারপর গাছের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল। পথের পাশেই একটি ক্ষীণকায়
পাহাড়ি ঝর্ণা। একটু
থেমে ঝর্ণা থেকে পানি খেয়ে তৃষ্ণা মিটিয়ে নেয়
সে। পানি ঠাণ্ডা এবং ক্লান্তি দূরকারী।
ফলে তার তৃষ্ণা আরো বেড়ে যায়। আবার
পেটপুরে পানি খায় সে। পাহাড়ের যে দিকে সে ছিল সেখানে সূর্য
অবাধে আলো ছড়িয়ে চলছিল। ধুলোময় পথ ও
পাথর বেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
পায়ে পাথরের গরম ছোঁয়া অনুভব করে সে।
এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে হাঁটছে,
সুতরাং অর্ধেক পথ এতক্ষণে পেরিয়ে এসেছে বলে তার ধারণা।
তখনও সামনে এক পাল ছাগল
তাড়িয়ে আনা একটি বালককে দেখতে পায় সে।
জিজ্ঞেস করে : নদীটা আর কত দূরে? গ্রাম্য ছেলেটি তার দিকে চেয়ে বন্ধুত্বের
হাসি হাসে। বলে : বেশি দূরে নয়। আর
একটি পাহাড় পেরোলেই দেখবে পথ
সোজা নদীর দিকে নেমে গেছে। ছেলেটিকে দেখে মনে হচ্ছিল কে ক্ষুধার্ত।
সে তার ব্যাগ খুলে রুটি বের করে সমান
দু’ভাগে করে। তারপর একটি ভাগ ছেলেটির
দিকে বাড়িয়ে দেয়। পাহাড়ের কিনারে দু’জন
বসে পড়ে। নীরবে খাওয়া শেষ করে তারা। দু’জনে এক সাথে চলতে থাকে। পরস্পর
কথা বলতে থাকে অনর্গল। তাদের কথা যেন
শেষ হওয়ার নয়।
গল্পে গল্পে ছেলেটি পায়ে পাথরের গরম
ছোঁয়া, সূর্যের প্রখর তাপ, কতটা পথ
পেরিয়ে এসেছে এবং সামনে কতটা পথ আছে তার সব কিছুই ভুলে যায়। কিন্তু কিছুক্ষণ
পর সঙ্গী গ্রাম্য
ছেলেটি আরেকটি পথে অগ্রসর হয়। সে তখন
বাস্তব জগতে ফিরে আসে। ছাগলের পাল নিয়ে ছেলেটি চলে যায়।
সে আবার একা হয়ে পড়ে। পথের ওপর
বা নিচের দিকে আর কাউকে দেখতে পেল না।
তাদের নিজের বাড়িটি পাহাড়ের এ
জায়গা থেকে চোখে পড়ে না, অন্য
দিকে নদীটিও দেখা যায় না। এ সময় একাকীত্ব ও ক্লান্তি তাকে চেপে ধরে।
সাথে যদি কেউ থাকত তাহলে বোধ হয়
এমনটি হতো না। একাকী হওয়ার
কারণে ক্লান্তি ও নিঃসঙ্গতায় আক্রান্ত
হয়ে পড়েছে সে। ঐ ছেলেটির সাথে সবটুকু
রুটি খেয়ে ফেলা ঠিক হয়নি বলে তার মনে হলো। এরপর ক্ষুধা লাগলে সে কী খাবে?
মনটা চিন্তায় ভারী হয়ে ওঠে।
এদিকে ফিরে যেতেও মন চাইছে না।
অর্ধেকের বেশি পথ চলে এসেছে,
নদীটি তাকে দেখতেই হবে।
না দেখে বাড়ি ফিরবে না সে। ফিরে গেলে ব্যর্থতার এ লজ্জা সারাজীবন
তাকে বয়ে বেড়াতে হবে। বালকটি এগিয়ে যেতে থাকে। রোদের তীব্র
তাপ, ধুলাভরা পাথর ছড়ানো পথ, পর্ণ কুটির ও
বিস্তৃত ধানের মাঠের কিনার
দিয়ে সে চলতে থাকে। এক সময় এমন এক
জায়গায় পৌঁছে, সেখানে আর কোন মাঠ
বা পর্ণ কুটির কিছুই নেই আছে শুধু জঙ্গল, সূর্য ও একাকীত্ব। কোথাও জন-মানুষের কোন চিহ্ন
নেই। চারদিকে গাছ, পাথর, কাঁটাঝোপ,
নানা রকম ফুল আর অখণ্ড নীরবতা। তবে এ
নীরবতার রূপ সম্পূর্ণ আলাদা। কেমন যেন
ভীতি জাগায়। ঘর বা রাস্তার নীরবতার মত
নয় যেন মহাশূন্যের অসীম বিস্তৃতি বা অজ্ঞাত কিছু। কোথাও কোন প্রাণীর সাড়া নেই বালকটির পায়ের নিচে ঘাস চাপা পড়ার
ক্ষীণ শব্দ শুধু শোনা যায়। পাইন গাছগুলোর
অনেক ওপরে ঘুরপাক
খেয়ে চলেছে একটি বাজপাখি। সামনে পথ একটি তীক্ষè বাঁক নিয়েছে।
বাঁকটি ঘুরতেই সমস্ত নীরবতা ভেঙে চারপাশ
শব্দমুখর হয়ে ওঠে। নদীর কল গর্জনের শব্দ
শোনা যায়। অনেক নিচে উপত্যকার ওপর
দিয়ে নদীটি প্রবল বেগে ছুটে চলেছে। নদী দেখে মুহূর্তের জন্য বালকটি সম্বিৎ
হারিয়ে ফেলে। পর মুহূর্তেই দৌড়াতে শুরু
করে নদীর দিকে। পাথরে হোঁচট
খেয়ে পড়ে যায়। উঠে আবারও দৌড়াতে থাকে। হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে আছে সে। আহ!
অবশেষে নদীটির দেখা পেয়েছে। মুগ্ধ বিস্ময়ে সে চেয়ে থাকে নদীর দিকে।
কী সুন্দর স্বচ্ছ পানি! কী ঠাণ্ডা! তার
সারা শরীর ও মন জুড়িয়ে যেতে থাকে।
Read More...

☺ একজন ভোলা চাচা ☺দিলারা মেসবাহ♪

Leave a Comment

আজ আনন্দদের বারান্দার গ্রিলে অপূর্ব সুনীল প্রজাপতি যেন বসে বসে আলাপচারিতায় মগ্ন হয়ে আছে। সবুজ পাতার ভেতর নীল প্রজাপতি! কী অপূর্ব!
আনন্দের
মা সানজিদা নবী খুশিতে আত্মহারা। তিনি একজন প্রকৃত প্রকৃতিপ্রেমিক মহিলা। প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন আনন্দেÑ
Ñ ‘ওরে আনন্দ, মৌটুসী দেখে যা নীল প্রজাপতির মেলা।’
ওরা দুই ভাইবোন হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তে নিজেকে সামলে নেয়।
Ñ ‘কই মামণি, কই দেখি দেখি কতদিন প্রজাপতি দেখি না আমরা।’
বারান্দায় এসে ওরা দুই ভাইবোনের ডাগর ডাগর চোখজোড়া কৌতুকে চক চক করে ওঠে।
Ñ ‘ওমা, কতগুলো অপরাজিতা ফুটেছে তোমার টবের গাছে। হ্যাঁ মা ঠিক যেন নীল প্রজাপতি। বারান্দাটা যেন হাসছে।’
ওরা সবাই মিলে চোখেমুখে হীরের দ্যুতির মতো আলো ছড়িয়ে হাসছে। দক্ষিণের বারান্দায় যেন ফুলের মেলা বসিয়েছে। মা মধ্যমণি! এই ছোট্ট বারান্দাটার তেরছা রোদের আঁকিবুকি ঝিরিঝিরি বাতাসের মধুর মমতা আর প্রিয় গাছলতা, লতাগুল্মের সবুজ মায়াবী এক চিলতে ভুবন সানজিদার একান্ত বিনোদনের আয়োজন। সকালে বা বিকেলের গরম চা হাতে এখানে বসে গাছের পাতা পল্লব আধফোটা ফুলকলিদের সঙ্গে কথা বলেন সানজিদা। পৃথিবীর সকল ভাবনা- দুর্ভাবনা কর্পূরের মতো মিলিয়ে যায়। মনটা তরতাজা হয়ে ওঠে। তিনি আবার নতুন প্রাণশক্তি ফিরে পান। সংসারের কাজে, চাকরি ক্ষেত্রে সবখানে যেন পরিশ্রম করার মালমসলা জোগাড় হয়ে যায়।
মৌটুসী আবিষ্কার করে হলুদ গোলাপের তিনটি কুঁড়ির অস্তিত্ব। কী সুন্দর! মা ভাইকে বলতে ওরা যেন খুশিতে আত্মহারা! আনন্দ বলে,
‘মায়ের এই ব্যালকনি যেন বেহেশতের এক টুকরো বাগান।’
সানজিদা ছেলের এই প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা উপভোগ করেন। তাঁর দুই ছেলেমেয়েই গাছগাছড়া ভালোবাসে। পাখ- পাখালি ভালোবাসে, ভালোবাসে নদী, জলাশয়-পুকুর।
শাপলাফোটা দীঘি দেখে ওরা তো ভারী খুশি হয়েছিল
একবার ড. খানের এক বন্ধুর বাগানবাড়িতে যেয়ে। আশুলিয়ায় যেয়ে সেবার দিনভর কী আনন্দই না করেছিল ওরা দুই ভাইবোন! কত জাতের গাছগাছড়া। লাল পেয়ারা, সফেদা, ডালিম, করমচা, এমনকি অগ্নিশর্মা কলা পর্যন্ত। আর একধারে শুধু মেহগনি, সেগুন আরো কত জাতের কাঠের গাছ। বেশ বড় হয়েছে। প্রায় অরণ্য অরণ্য ভাব। ঢাকার দূষিত বাতাসের বাইরের এই গ্রামীণ দৃশ্যটা খুব ভালো লেগেছিল ওদের। শাপলাফোটা দীঘিতে ছোট মাছের ঝাঁক দেখে মৌটুসী আনন্দে আত্মহারা। আশুলিয়ায় ফুরফুরে বেলফুলের মতো ভাত আর রুইমাছের ভাজা মুগের ডাল। কী চমৎকার লেগেছিল খেতে! বাবুর্চি ভাই আক্কাস মিয়া ঘাড়ে লাল গামছা ফেলে মুখে জর্দাভরা পানের খুশবু। হাসিমুখ দেখলে প্রাণে জুড়িয়ে যায়। কত যতœ করে যে খাবার পরিবেশন করলেন। আজো মনে পড়ে আনন্দ আর মৌটুসীর। সানজিদা পাখ-পাখালি ভালবাসেন। দূরে কোথায় যেন একটা প্রাচীন বৃক্ষ থেকে ঘু-ঘু ডাকছিলÑ অবিরাম ঘু-ঘু-উ। ঘু-ঘু। কী যে ভালো লাগছিল মৌটুসীর মায়ের। সেই দিনটি ওদের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে!
আজ ভোরবেলা সিরাজগঞ্জ থেকে এসেছেন ভোলা চাচা। এসেই ইইচই করে হাঁক ছাড়লেন,
‘কই রে সানজি কই রে আনন্দ মৌ? কই তোরা।’ সানজিদা কিচেনে গরুর গোশতের মসলা কষাচ্ছিলেন। প্রায় দৌড়ে এলেন। ভোলা চাচা এসেছেন অনেক দিন পর। ভোলা চাচা হলেন আনন্দদের পরিবারের খুশির সাগর। যেমন প্রাণবন্ত তার রসালো আলাপচারিতা, তেমনি তাঁর ভাল কাজ করার আগ্রহ। তিনি যেন অশেষ জ্ঞানের ভাণ্ডার। পৃথিবীর যাবতীয় বিষয়ে তার অসীম জানাশোনা। মগজ তো নয় যেন কম্পিউটার। দেশের জন্য ভালোবাসা আর খুঁটিনাটি তথ্য তাঁর ভাণ্ডারে গিজগিজ করছে। জন্মভূমিকে তিনি প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসেন। আর সবাইকে বিশেষ করে ছোটদের ভোলা চাচা বিভিন্ন তথ্য শুনিয়ে শুনিয়ে পাকা দেশপ্রেমিক করে তুলতে চান। তাঁর আর একটি বড় গুণ যে তিনি প্রকৃতিপ্রেমিক। মনেপ্রাণে প্রকৃতি ভালোবাসেন। অনেকে তাঁকে গাছপাগল ভোলা চাচা বলো ডাকে। এহেন ভোলা চাচা যখন তার দীর্ঘ দেহ টকটকে রঙ আর মজবুত কাঠামোর শরীরের গড়ন নিয়ে হাসিমুখে উদয় হলেন আনন্দদের নিরিবিলি ফ্যাটটি আর নিরিবিলি রইল না। খুশির বাতাসের তুর্কিনাচন ঢেউ তুলে তুলে খেলে গেল সারা ঘরময়। সানজিদার চোখে-মুখে আনন্দের ঝিলিক। মেঝের সফেদ টাইলসে যেন রঙধনু রঙ ঘরময় যেন নীল-লাল প্রজাপতি। বহুদিন পর এবার এলেন ভোলা চাচা! চাচা থাকেন সিরাজগঞ্জ। এক বিঘা জমির ওপর তার গাছগাছালি পাখপাখালিতে ভরা সোঁদা মাটির
গন্ধভরা একান্ত ভুবন। চাচীমাও খুব আমুদে মানুষ। পাকা গৃহিণী। তবে ইদানীং বাতের ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছেন। সাজুর মা আর তার ছেলে ছেলেবৌ ‘শান্তিনীড়ে থাকে’। দীর্ঘদিন। ওরাই দেখাশোনা করে। কাজের মানুষ নয় বরং আত্মীয়ের মতো সাজুর মা। আজ তিরিশ বছর হল ঐ বাড়িতে। বাবা ত উদাসীন কর্মব্যস্ত পরোপকারী এক মানুষ। ঘর সামলান। লাল চাচী। সাজুর মা, সাজু। কত যে কাঁঠাল হয়, আম হয়, করমচা, জামরুল, কদবেল পর্যন্ত। গাছপালা ফলাফলারি খোপভরা কবুতর, দরমা ভরা মোরগ-মুরগি, ক্যাম্বেল হাঁস।
তো সানজিদা দৌড়ে এসে প্রিয় চাচাকে সালাম জানালেন।
‘চাচা এতদিন পর আমাদের কথা মনে পড়ল! চাচা আপনার শরীর ভালো আছে তো! চাচীমা কেমন আছেন? সাজুর মা-রা?’
‘ওরে বাপরে বাপ সব্বোনাশ! এতগুলো প্রশ্ন করলি মা একসাথে জবাব দিতে যে আমার আলজিহ্বা পর্যন্ত শুকিয়ে যাবে। আগে এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি দে মা।’
সানজিদা খুশিতে কী করবে না করবে যেন দিশা পায় না।
‘চাচা … দিচ্ছি আমি কী বোকা দেখেন আগে আপনারে জিরাতে না দিয়েই হাজার প্রশ্ন করছি। এই সোফাটায় আরাম করে বসেন তো চাচা। আমি চটপট কাগজি লেবুর শরবত করে আনছি বরফ দিয়ে।
‘ওরে আমার পাগলিরে! তোর এই দশাসই চাচার
যে চিনি খাওয়া নিষেধ ভুলে গেছিস! রোগ আছে যে ডায়াবেটিস মধুমেহ।’
সানজিদা দরদি গলায় বলে,
‘চাচা চিনি দেবো না। স্পেনডা দিয়ে করে দিচ্ছি। খান, যে হারে আপনি দৌড়াদৌড়ি করেন মাঝে মধ্যে একটু অনিয়ম করলে কিচ্ছু হবে না।’ ‘হ্যাঁ মা, তাই অবশ্য আল্লাহর রহমে সুগার লেবেল আমার ভালোয় কন্ট্রোলে আছে। সামান্য ট্যাবলেট খাই। ডায়েট কন্ট্রোল করি। ব্যস। দেহঘড়ি টিকটিক করে চলছে ভালো। আল্লাহ ভরসা। শোন মা, তোরা কিন্তু সবসময় মনটা প্রফুল্ল রাখার চেষ্টা করবি। প্রাণ খুলে হাসবি। ছেলেমেয়ে জামাইকে নিয়ে বেড়াতে যাবি। সম্ভব হলে এক সাথে নামাজ পড়বি। ধর্মের ছায়া বড় শান্তির ছায়া। আর সমাজসেবা মানবসেবা। কী আনন্দ মারে! বুকটা জুড়িয়ে যায়। তুই তো কলেজে পড়াস। চিরদিনের মেধাবী মেয়ে। তোকে আর কী বলবো। তবু বলি একটা অভ্যেস হয়ে গেছে। এই যে ছোট্ট জীবন আল্লাহ দিয়েছেনÑ এই জীবন অমূল্য, প্রতিটি মুহূর্ত আনন্দ ভালো কাজ দিয়ে ভরাট করে রাখার জন্য। মন আর শরীর যদি বিগড়ে যায় তবে তো সবই ভেস্তে যায়। তখন ধর্মে কর্মে মন বসে না। মাননসেবা তো দূরের কথা। কেমন লেকচার শুরু করে দিয়েছি দেখেছিস তো। ঢেঁকি যেখানে যায় সেখানেই ধান ভানতে চায় রে মা। আন তোর ঠাণ্ডা শরবত খেয়ে প্রাণ জুড়াই। তারপর এই ঝোলায় তোর চাচী কী ভরে দিয়েছেন বুঝে নে।’
সানজিদা চটজলদি এক গ্লাস বরফভাসা লেবু শরবত আপেলের টুকরো সাজিয়ে ট্রে হাতে চাচার সামনে দাঁড়ায়। চাচা ঢকঢক করে শরবতটুকু শেষ করে হাতের তালুর উল্টাপিঠে ঠোঁট মুছে তার কাঁধের ঝোলা খুলে বসেন।
সানজিদা কৌতূহলী চোখে চেয়ে থাকে। আনন্দ আর মৌটুসীও ছুটে এসেছে ততক্ষণে।
ভোলা চাচা প্রশস্ত এক হাত বাড়িয়ে ওদের আদর করেন আর এক হাতে পুঁটলিগুলো টিপয়ের ওপর সাজাতে থাকেন।
সানজিদা জাদুর পোটলাগুলো খুলতে থাকে। একটায় ফুলের মতো কুমড়ো বড়ি, আর একটাতে তিলের নাড়–, আর একটাতে তেলের পিঠা, আর একটাতে আনন্দের প্রিয় নারকেলের
বরফি। দুপুরে খাবার টেবিলে ঝুরঝুর করে ঝরে মায়ামমতার ফুলরেণু। সানজিদা চাচা ও ছেলেমেয়েদের পাতে পাতে গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত তুলে দেন। চিংড়ি মাছের ভর্তা, করলা ভাজি, পাবদা মাছ, মাসকলাইয়ের ডাল তুলে দিতে দিতে শান্তনীড়ের আত্মীয়স্বজন, পাড়া-পড়শি সবার খবর নেন। মৌটুসী মুরগি ছাড়া ভাত খেতে চায় না। আজ ভোলা নানার সঙ্গে বসে করলা ভাজিও খেল, মাছও খেল। মুরগি তরকারি পুরোটাই তোলা রইল। রাতে চাচা পাতলা রুটি দিয়ে খাবেন। সঙ্গে থাকবে সবজি ভাজি। ভোলা চাচার খাবার-দাবার পরিমিত। সকালে হাঁটা, নামাজের কিছুক্ষণ হলেও কুরআন তেলাওয়াত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
বিকেলের ফিকে কমলারঙের রোদ ব্যালকনি ভরে সোহাগ ছড়াচ্ছে। ওখানে সানজিদার ব্যাবিলনের শূন্যোদ্যান। চাচার প্রিয় এই জায়গাটা। আনন্দ আর মৌটুসীকে মোড়ায় বসিয়ে ভোলা নানা এবার গল্প জুড়ে দিলেন।
‘নানাভাই, বুবুজি আজ তোমাদের বাংলাদেশের
নদীর গল্প শোনাব, কেমন?’
ওরা খুশিতে চিৎকার করে ওঠে। ‘হ্যাঁ নানু আমরা শুনব। আমরা তো এই শহরে একটা নদীও চোখে দেখি না। মা বলেন, একদিন বুড়িগঙ্গায় নৌবিহারে নিয়ে যাবেন কিন্তু নিয়ে যাবার সময় আর হয় না।’ ‘শোন নানু ভাই আমাদের এই বাংলাদেশটা না নদীমাতৃক দেশ। এখন এই ঢাকা শহরের চেহারা যেমন দেখছ মাত্র তিরিশ বছর আগেও এ শহর এ রকম ছিল না। বিশাল বিশাল বৃক্ষ, পাখপাখালি আর হালকা বাড়িঘর, কম গাড়ি ঘোড়া, জন-মানুষ। বেশ পরিপাটি ঐতিহাসিক এ শহর। গৌরবের ৪০০ বছর কেটে গেছে। কিন্তু নানুভাই এ নগরটি আমার কাছে এখন মাঝে মধ্যে বসবাসের অযোগ্য মনে হয়। সে যাক, বড় হয়ে আরো অনেক কিছু জানতে পারবে। দেখ আমাদের ভাগ্য এ শহরে আজ বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, ফল পাকুড়, সবজি, মাছ, তেল, ঘি সবখানে বিষ-ফরমালিন ভয়াবহ কেমিক্যাল মিশায় এক জাতের লোভী ব্যবসায়ী। তাহলে এ দেশটা আরো বড় উন্নত হবে কী করে। আর কিছু মানুষ হয়ে উঠেছে অসহিষ্ণু, মারমুখী, কুচক্রী। তারা সমাজটাকে নষ্ট করছে। তবে হ্যাঁ, তোমরা যদি নতুন মানুষেরা বড় হয়ে রুখে দাঁড়াও, ভালো শিক্ষা, ভালো মানসিকতা প্রাণের মধ্যে ধারণ করো তবেই এ দেশটা হবে আবার সুন্দর, সুজলা, সুফলা সোনার দেশ। কী কইতে কী বয়ান শুরু করলাম। যাক আমি তোমাদের এই বাংলার কয়টা নদ-নদীর নাম বলি, তোমরা শোন। বর্তমান নদ-নদী সংখ্যা প্রায় ৩১০টি। এর মধ্যে ৫৭টি আন্তর্জাতিক নদী। এই নদীগুলোর ৫৪টি ঢুকেছে ভারত থেকে। শুধু ৩টি মিয়ানমার থেকে। মানে বার্মা থেকে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ছে। ভারতের অভিন্ন সীমান্ত নদীগুলো হচ্ছে রায়মঙ্গল, ইছামতি, কালিন্দি বেতনা, কোদালিয়া, ভৈরব, কোবাদক, গঙ্গা, পাগলা, আত্রাই, পুনর্ভবা, তেঁতুলিয়া, ট্যাঙ্গন, নাগর, মহানন্দা, ডাহুক, করতোয়া, ঘোড়ামারা, যমুনেশ্বরী, বুড়িতিস্তা, তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র, সুমেশ্বরী, নয়াগাঙ, সুরমা, কুশিয়ারা, ধলাই, গোমতী, ডাকাতিয়া, মহুরী, ফেনী ইত্যাদি। আর মিয়ানমার থেকে এ দেশে ঢুকে পড়েছে সাঙ্গু, মাতামুহুরী ও নাফ। এ দেশের বড় বড় নদীর নাম তোমরা সবাই কমবেশি জানো। মেঘনা, যমুনা, পদ্মা, বুড়িগঙ্গা, গড়াই আরো কত নদ-নদী, শাখা নদী এ দেশের আনাচে কানাচে। শাখা নদীগুলোর সুন্দর সুন্দর গালভরা নামও আছে। আরেক দিন তোদের শোনাব নানু। জানার শেষ নেই। দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত শুধু জানলেও জানার
শেষ নেই। আনন্দ, মৌ তোমাদের অনেক বড় হতে হবে। অনেক বড়, বিদ্যায়-বুদ্ধিতে, আচারে-ব্যবহারে। তার মানে একজন ভালো মানুষ হতে হবে সবার আগে। তবেই হবে জীবন সার্থক। শুধু নিজের কথা ভাববে না নানুরা দশের চিন্তা মাথায় রাখবে। বিশেষ করে যারা খুব গরিব মানে হতদরিদ্র তাদের নিয়েও ভাবতে হবে। তাদের না আছে সামান্যতম শিক্ষা অর্থাৎ নিরক্ষর আর না আছে কোন সহায় সম্বল। দিন আনে দিন খায়। কী যে কষ্টের জীবন! বড় হলে বুঝতে পারবে এই সব মানুষকে। এ সংসারে কিভাবে বেঁচে আছে। ওরা এমনই এক নিরেট মানুষে পরিণত হয়েছে যে ওদের ভালো শিক্ষা, ভালো কাজের কথা বললেও আগ্রহ দেখায় না বেশির ভাগ মানুষ। ভাগ্য পরিবর্তনের বিষয়টা ওরা বোধ হয় বুঝতেই শেখেনি। শৈশব থেকেই ধরে নেয় আমরা গরিব-হতভাগাÑ এটাই আল্লাহর ইচ্ছা এই আমাদের জীবন। ওদের অনেকের মধ্যে আলোচ্য স্থবিরতাও কাজ করে মনমর্জি অনেক নিম্নস্তরের। ওদের বোঝাতে হবে। লেখাপড়া আর কর্ম দুটোই যেন ধীরে ধীরে ওরা অর্জন করতে পারে। সেই চেষ্টায় নিবেদিতকর্মী প্রয়োজন। তোরা বড় হয়ে নিজের কর্মজীবনের পাশাপাশি এদের জন্যও ভাববি। সাহায্য সহযোগিতা করবি। তবেই না এ দেশটা সুন্দর হয়ে উঠবে। যাক অনেক নসিয়ত করে ফেললাম। জানিস তো নানু শিক্ষকতা থেকে অবসর নিলে কী হয়Ñ রক্তের মধ্যে সে বীজ রয়েই যায়। পৃথিবীশুদ্ধ মানুষকে তখন ছাত্র ঠাওরায়ে অবচেতন মনে। করার কিছু নেই রে নানুভাই।’ ভোলা নানুর ভারী ভারী অথচ সুন্দর কথাগুলো খুব ভালো লাগল আনন্দের। যদিও কথাগুলো একটু ওজনদার ফট করে বুঝে নিতে সময় লাগে খানিক, তবে একবার মাথার মধ্যে ঢুকে গেলে সবই সহজ খাঁটি কথা। মৌটুসীরও নানুর বাণী বুঝতে একটু কষ্ট হলেও এখন ভালো লাগছে। আনন্দ পড়ে কাস সেভেনে আর মৌটুসী কাস সিক্সে। ওরা দুই ভাইবোনই সাধারণ বাচ্চাদের চাইতে একটু এগিয়ে আছে। সাধারণ জ্ঞানের বহরটা একটু লম্বা। তা অনেক ক্ষেত্রেই ভোলা চাচার কল্যাণে।
আজ ওরা ভোলা চাচার সঙ্গে যাবে বলধা গার্ডেনে। ধানমন্ডি থেকে নারিন্দায় যেতে ওদের সময় লাগল প্রায় দেড় ঘণ্টা। ভোলা নানা এই ঢাকা শহরের যানজট দেখে অস্থির। অবশ্য আজকাল বাংলাদেশের প্রায় সব শহরেরই এই দশা। তবু ঢাকা শহর যেন এ দুর্দশার এক নম্বর। শহর তো নয় যেন পুরো হাইওয়ে জুড়ে মাছের বাজার বসেছে। তারই মধ্যে রিকশা, গাড়ি, হরেকরকমের যানবাহন, বিশাল বিশাল বাস। ভোলা নানা গোপীবাগ যেয়ে হাঁফিয়ে উঠলেন। ‘আর কতদূর সেন্টু মিয়া। ড্রাইভার এক গাল হেসে বলল, ‘নানাজান দূর তো বেশি না। কিন্তুক জাম লাগছে কিরহম দেখছেন তো। কিছুই কওন যায় না। আল্লাহর যদি রহম করে তাইলে এই জট থ্যাকা বাইরে হইতে পারুম।’
অবশেষে ওরা পৌঁছল বলধা গার্ডেনে। জমিদার অনেক যতেœ, মমতায় এই বাগান তৈরি করেছিলেন বহু বছর আগে। যদিও আগের সেই জলুস নেই। তবুও কিছু কিছু দুর্লভ প্রাচীন গাছ লতা, গুল্ম, ক্যাকটাস ফার্ন এখনও আছে। প্যাপিরাস গাছের গল্প শুনেছে মায়ের কাছে আনন্দ। এখানে কৃত্রিম পন্ডে আছে ভিক্টোরিয়া রিজিয়া। বিখ্যাত জলজ পদ্মজাতীয় ফুল একে বাংলায় দেও-পদ্মও বলে। কান্দা তোলা একটা থালার মতো সুবজ পাতা। এর পাতার ওপর নাকি একটা ছোট শিশু বসে থাকতে পারে। বড় সুদৃশ্য ধাঁধানো ঘাটলার দীঘি। দীঘির পারে জয় হাউজ সেখানে বসে। এখানে এসে রবীন্দ্রনাথ ক্যামেলিয়া কবিতাটি রচনা করেছিলেন। এই
বাগানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে আরেক ধনাঢ্য ব্যক্তি রোজ গার্ডেন তৈরি করেন গোপীবাগে। তিনি ছিলেন বলধা জমিদারের চেয়ে একটু কম বংশীয়। সে কারণে শোনা যায় বলধার উৎসবে তার আমন্ত্রণ হতো না। রোজ গার্ডেনের জন্ম হয় এই অপমান থেকে। এক সময় রোজ গার্ডেনে প্রচুর পুষ্পের বাহার ছিল। এখন আর নেই। সুরম্য প্রাসাদটি এখনও কালের সাক্ষী হয়ে আছে। আনন্দ মৌটুসীকে নিয়ে ভোলা চাচা রোজ গার্ডেনেও বেড়িয়ে এসেছেন। কিন্তু তিনি মূলত গাছপাগল এক মানুষ। প্রাসাদ নয়Ñ গাছ, লতা,
ফুল তার প্রিয়। বলধা গার্ডেনে অশোক বৃক্ষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন গাছলতা তিনি চেনালেন ওদের। কিছু কিছু গাছের গায়ে নাম লেখা আছে। সোনালি বাঁশঝাড় আর বার্ডস অব প্যারাডাইস বা বেহেশতি বুলবুল সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে।
ভোলা চাচা বহুবার এসেছেন ওয়ারির বলধা বাগানে। তিনি তো বৃক্ষপ্রেমিক। এবার বলধা বাগানে এসে একটু হতাশ হলেন।
‘নানুভাই! দেখ বলধা বাগানের চার পাশে ফ্যাটবাড়ি উঠছে। বাগান দুটোও যেন নিঃশব্দে কাঁদছে। আগের মতো যতœ নেই। গাছপালাগুলো যেন খানিক বিবর্ণ আর প্রাণহীন। ’
আনন্দ মাথা দোলায়। ওরা বাসায় ফিরে গোসল করে খাবার খেয়ে বিশ্রাম করে যখন ওঠে, তখন বিকেল ফিকে হয়ে এসেছে। ভোলা নানা আসরের নামাজ সেরে জায়নামাজ ভাঁজ করে সুন্দর তসবিহদানাগুলো একান্ত মনে গুনতে গুনতে পায়চারি করছেন করিডোর জুড়ে। যেখানে কয়েকটি সবুজ ক্যাকটাস ছায়ার গুল্মলতা মাটির সুন্দর সুন্দর পটে আনন্দের মা সাজিয়ে রেখেছেন।
চায়ের
টেবিলে বসে ভোলা নানা গাছলাতাগুলোর কত গল্পই না করলেন। এই প্রকৃতি যদি মানুষের হাতে বিনাশ হয়ে যায় তবে সর্বনাশ হবে মানুষেরই।
ভোলা নানা বোঝালেন। গাছের সে জীবন আছে, অনুভূতি আছে সে কথা আবিষ্কার করেন আচার্য জগদীশ চন্দ্র। বর্তমানে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিকের গবেষণায় জানা যায় গাছ চিন্তাশীলও বটে।
তার ভরাট গলায় বললেন,
‘শোন নানুভাই, বুবু দেশী ফলমূল তো তোমরা চেনোই না স্বাদ নেয়া তো দূরের কথা। চালতা, গোলাপজাম, আঁশফল, দেওফল, ডুমুর, লটকন, চুকুর, বইচি, গাব, কাউফল, মহুয়া, মাখনা, বিলিম্বি আরো কত কী।’
এবার সিরাজগঞ্জ গেলে আমি তোমাদের গ্রামগঞ্জের হাট থেকে কিছু কিছু ফল দেখাবো, পরিচয় করিয়ে দেব, খাওয়াবো, কেমন। ওরা দুই ভাইবোন মাথা দোলায়,
‘জি আচ্ছা নানা ভাই।’
‘আর নানুভাই শাক যে আছে কত রকমের তোমরা তাও দেখনি, খাওনি। তোমরা চেন পালংশাক, লালশাক, পুঁইশাক না? এর বাইরে আছে টক-পালং, পাটশাক, কুফালশাক, পিড়িংশাক, কলমিশাক, হেলেঞ্চা, শুষনীশাক, আশকুনি, ব্রাক্ষীশাক ইত্যাদি। আমার মা বেতের ডালা হাতে নিজে বাড়ির পেছনের
বিশাল আমবাগান থেকে শাক তুলে আনতেন আর মজা করে রাঁধতেন। আর জানো কত জাতের ধান আছে এই বাংলাদেশে? আজকাল অবশ্য আগের মতো সব ধান আবাদ হয় না। ভাল আউশ ধানের মধ্যে আছেÑ দুলার, ধারিয়াল, কটকতারা, পানবিড়া, মরিচাবাটি, চার্নক, কুমারী ইত্যাদি। আমন ধানের মধ্যে আছে নাইজারশাইল, লতিশাইল, দুধসর, রাজাশাইল, পাটনাই, বাদলাভোগ, কালিজিরা ইত্যাদি।’
মাগরিবের নামাজ পড়ে, ভোলা চাচা অনেকক্ষণ জায়নামাজে বসে দোয়া-দরুদ পড়লেন। এই মানুষটা নাকি প্রায় দুই হাজার বিভিন্ন ফল, কাঠ, ফুল ইত্যাদি গাছ লাগিয়েছেন। সব নিজের আঙিনায় অবশ্যই নয়। পাড়াপরশি, স্বজন, বন্ধুদের ভিটেয়। সেইসব গাছ এখন তরতরিয়ে বেড়ে উঠেছে। ফল হয়, ফুল হয়, কাঠের গাছ মেহগনি, শাল ইত্যাদি তো মূল্যবান হয়ে উঠছে। সব বিনা পয়সায়। নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে যতœশ্রম দিয়ে। এতেই তার আনন্দ!
অনেকক্ষণ
ধরে ভোলা নানা জায়নামাজে বসে তসবিহ গুনছেন। আনন্দ উঁকি দিয়ে দেখে ভোলা নানা অঝোর ধারায় কাঁদছেন। আনন্দ দৌড়ে মাকে মেয়ে বলতেই মা বললেন,
‘কথা বলিস না। ভোলা চাচার বুকের ভেতর একটা গভীর দুঃখ আছে রে। আমরা জানি। ওনার ফুলের মতো ফুটফুটে ছেলেটা পেয়ারা গাছ থেকে পড়ে মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পেয়ে মারা গেছে। সে কথা, সে বেদনা উনি বুকের ভেতর চেপে রেখে বাইরে হাসি- আনন্দে ভুলে থাকেন। আমার সেই ভাইটার নাম ছিল মুনতাসীর।’
আনন্দের ডাগর চোখ থেকে দুই ফোঁটা অশ্রু ঝরে পড়ল। মৌটুসী অবাক হয়ে করুণ চোখ মেলে চেয়ে আছে।
বাইরে তখন শ্রাবণের বৃষ্টির কান্না। মাও চোখ মুছলেন আঁচলে। সবার প্রিয় গাছপাগল ভোলা চাচা গাছগাছড়ার পত্রপল্লবে, ফুলের কুঁড়িতে হয়তো মুনতাসীরের ডাগর চোখ দুটো খুঁজে ফেরেন। এতেই তাঁর বেদনা, এতেই তাঁর বেহেশতি আনন্দ!
Read More...

ভালুক ও কাঠবিড়ালি | কিশোরকণ্ঠ

Leave a Comment
ইজায আহমদ
তরজমা : ড. আবদুল ওয়াহিদ একটি সুন্দর ছায়াঘেরা সবুজ-শ্যামল জঙ্গল।
জঙ্গলে বাস করতো একটি সুন্দর কাঠবিড়ালির
বাচ্চা। বাচ্চাটি ধীরে ধীরে বড়
হতে থাকে। ওর আম্মু-আব্বু ওকে শেখালো,
ভালোভাবে জীবন-যাপন পরিকল্পনা করার
জন্য নিজেই কামাই-রোজগার করার চেষ্টা করতে হবে। তাই, ওর আম্মু-আব্বু
ওকে স্কুলে ভর্তি করে দেন। যাতে ও
ভালো ভালো কথা-বার্তা শিখতে পারে। ও
জীবনে কাজে আসার মতো বিভিন্ন বিষয়
শিখতে পারে।
ওর স্কুল ছিলো বাসা থেকে কিছুটা দূরে। সেখানে অভিজ্ঞ এক বুড়ি কাঠবিড়ালি তার
ছাত্র বাচ্চাদেরকে খাবারের অনুসন্ধান,
গাছে ওঠা-নামা করা, গর্ত খোদা, শত্রু
থেকে নিরাপদ থাকা এবং অন্যান্য
প্রয়োজনীয় কথা-বার্তা ওদেরকে হাতে-
কলমে শেখাতেন। কাঠবিড়ালির বাচ্চা জানতো ও এখনো ছোট।
এজন্য ওর কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে ওর আম্মু-
আব্বু ব্যবস্থা করে দেবেন। কিন্তু কাল ও বড়
হলে ওর আম্মু-আব্বু
বুড়ো হয়ে গেলে তো ওকে নিজের জন্যই নয়,
আম্মু-আব্বুর জন্যও সবকিছু ওকেই রোজগার করে আনতে হবে। এজন্য ওকে আন্তরিকতার
সাথে স্কুলের সব পাঠ শিখতে হবে। সেজন্য
কাঠবিড়ালির বাচ্চা প্রতিদিন স্কুলে যেতো।
কখনো সে স্কুল কামাই দিতো না। মনোযোগ
দিয়ে পাঠ শিখতো। স্কুল থেকে বাসায়
ফিরে এসেও ও স্কুলের লেখাপড়া শিখতো ভালোভাবে।
প্রতি সপ্তায় কাঠবিড়ালির বাচ্চার স্কুল
বন্ধ থাকতো একদিন। ছুটির দিন ও আম্মু-আব্বু
বা আশপাশের বন্ধুদের
সাথে খেলাধুলা করে কাটাতো। ওর
ইচ্ছা ছিলো ও আম্মু-আব্বুর সাথে কোনোদিন বাসা থেকে দূরে অনেক সুন্দর
স্থানে ভ্রমণে যাবে। ও বেশ ক’বার আম্মু-
আব্বুকে ভ্রমণে যাবার কথাও বলেছে। ওর আব্বু
অঙ্গীকারও করেছেন।
শীতে এক মনোরম রোদের দিন কাঠবিড়ালির
বাচ্চা ওর আম্মু-আব্বুর সাথে বাসা থেকে চলে গেলো একটু দূরে।
তারা খাওয়া-দাওয়া সাথে নিয়ে গেল।
তারা পৌঁছুলো সুন্দর এক স্থানে। বনের
মধ্যেই ছিলো জায়গাটি। পুরো জঙ্গলই
ছিলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। হাওর-
বাঁওড়ে ছিলো পানিভর্তি। সবুজ শ্যামল ঘাস, থোকায় থোকায় ফুল, বড় বড় গাছ, উঁচু উঁচু
পাহাড়-টিলা এবং পাখির কিচির-
মিচিরে মুখরিত ছিলো। কিন্তু
যেখানে তারা গেছে, সে জায়গা বনের
সবচেয়ে সুন্দর স্থান। কাঠবিড়ালির
বাচ্চা সেখানে গিয়ে খুবই আনন্দিত। ও আম্মু- আব্বুর সাথে বিভিন্ন ধরনের খেলায়
মেতে ওঠে। তারা কিছু সময় সেখানে কাটায়।
কিছুটা সময় কেটে গেলো। হঠাৎ দেখলো,
বনের অন্ধকার একটা অংশ
থেকে কালো ময়লা গায়ে একটি ভালুক ওদের
দিকে আসছে। ওই কালো ময়লাযুক্ত ভালুকের
পুরো জঙ্গলে অবস্থান ছিলো খারাপ। বনের
ছোট ছোট দুর্বল জন্তুদের সে বিনা কারণেই
ভয় দেখাতো এবং ধমক লাগাতো। ও কাউকেই
সুখী দেখতে পারতো না। ও সবাইকে কষ্ট
দিয়েই আনন্দ পেতো। বনের ছোট জন্তুরা ওর এমন নিষ্ঠুর আচরণে রেগে ছিলো।
মনে মনে ওকে গাল মন্দ করতো। কিন্তু
ওরা দুর্বল থাকায় ভালুককে তার খারাপ
অভ্যাস ত্যাগ করার কথা বলার সাহসও
কারো ছিল না।
বনের সব ছোট প্রাণী ওই ময়লা ভালুকের সামনে পড়তে ঘৃণা করতো। ভয় তো ছিলোই। ও
কোথাও এসে ধমকাতে থাকলে ছোট এবং দুর্বল
প্রাণীদের সেখান থেকে পালাতে হতো। কেউ
পালিয়ে না গেলে ভালুক তাকে মারতেও
কুণ্ঠাবোধ করতো না।
ভালুককে সেখানে দেখে কাঠবিড়ালি এবং ওর আম্মু-আব্বুর মুখ মন খারাপ হয়ে গেল। ওরা ভয়
পেয়ে যায়। ওরা বুঝে গেলো, ওদের এবার সব
কিছু ছেড়ে পালানো উচিত। ওরা খাবারের
সবকিছু সেখানেই ফেলে বাচ্চাকে পালানোর
ইঙ্গিত করলো। নিজেরাও
দৌড়ে পালাতে লাগলো। ময়লা কালো ভালুক কাঠবিড়ালিকে পালাতে দেখে খুব খুশি হলো।
ভালুক মনে মনে ভাবলো, ও খুব শক্তিশালী। সব
প্রাণীই ওকে ভয় পায়। ও
জোরে জোরে হাসতে থাকে। তার
অট্টহাসিতে মনে হলো ও বড় কোন দায়িত্ব
পালন করে এবার মুক্ত হয়েছে। কাঠবিড়ালির আম্মু-আব্বু পালিয়েছেন। কিন্তু
ও ময়লা কালো ভালুক থেকে একটু
দূরে গিয়ে ফিরে দাঁড়ায়। ওর ভ্রমণটি ভণ্ডুল
হয়ে যাওয়ায় ও খুব দুঃখ পেলো।
কালো ভালুকের এমন অত্যাচারে ক্ষিপ্ত হলো।
ভাবলো, এভাবে পালালে কী ফল হবে? ওর মাথায় এলো কালো ভালুকের
সাথে বোঝাপড়া করা উচিত। ওর
সাথে মারামারি করতে না পারলেও অন্তত এ
বিষয়টির তো প্রতিবাদ হওয়া দরকার। সবাই
বুঝুক ও নোংরা ভালুকের
অত্যাচারী স্বভাবকে মোটেও পছন্দ করে না এবং তাকে ঘৃণা করে।
নোংরা কালো ভালুক দেখলো, কাঠবিড়ালির
বাচ্চার আম্মু-আব্বু পালিয়েছে। কিন্তু ও
এখনো সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। ও খুব আশ্চর্য
হলো। আজ পর্যন্ত
কোনো প্রাণী ওকে দেখে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার সাহস করেনি। এই ছোট্ট প্রাণী এ সাহস
করছে কিভাবে? নোংরা ভালুক ভাবলো, ওর এ
ছোট প্রাণীকে কঠিন শাস্তি দেয়া উচিত।
এতে অন্য প্রাণীদেরও শিক্ষা হবে।
এটা তাদের জন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।
‘পালাও, বোকা কাঠবিড়ালির বাচ্চা’! নোংরা কালো ভালুক
রাগে ক্ষোভে মাটিতে পায়ের আঘাত
করতে করতে বললো। কিন্তু কাঠবিড়ালির
বাচ্চা চুপ করে নিজের জায়গাতেই
দাঁড়িয়ে থাকলো। মনে হলো ভালুকের ধমকে ও
একটুও ভয় পায়নি। এটা ভালুকের জন্য কোন অত্যাশ্চর্যের
চেয়ে কম ছিলো না। ভয় দেখানো এবং ধমক
দেয়ার পরও কাঠবিড়ালির
বাচ্চা স্বস্থানে দাঁড়িয়ে আছে! ও
রাগে ক্ষোভে অধৈর্য হয়ে কাঠবিড়ালির
বাচ্চার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। এক আঘাতেই কাঠবিড়ালির বাচ্চাকে দলে-মুচড়ে ওর
হাড্ডি-মাংস এক সাথে করে দিতে। কিন্তু
কাঠবিড়ালির বাচ্চা লাফিয়ে তার
জায়গা থেকে সরে যায়। ওদিকে ভালুক
জোরে সাথে ধাক্কা খেলো। ভালুক
ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। দেখলো তার এবং কাঠবিড়ালির বাচ্চার মধ্যে ব্যবধান
অনেক। এখন কাঠবিড়ালির বাচ্চা তার
নাগালের বাইরে। অনেক
দূরে চলে গেছে পিচ্চিটা।
নিজের এ চালাকিতে কাঠবিড়ালির
বাচ্চা বুঝলো সামনে এগোনো যায়। ও ব্যাটাকে শায়েস্তা করা কোনো ব্যাপার নয়।
আর একটু চালাকি খাটালেই বেটাকে কুপোকাত
করা যাবে। এটা এমন অস্ত্র যা ও ভালুকের
বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারে। ও ভাবলো,
যদি একটি ছোট কাঠবিড়ালির
বাচ্চা অত্যাচারী ভালুকের সামনে ফিরে দাঁড়াতে পারে, তা হলে অন্য
প্রাণীরাও তো ফিরে দাঁড়াতে পারে।
ওরা তো ভালুকের অত্যাচারের
কোনো প্রতিবাদ করেনি কখনো। এবার ওদের
মনেও সাহস এলো। ওরা এতদিন
ফন্দি আঁটছিলো। ওরা ভালুকের আচরণ তীক্ষè দৃষ্টিতে দেখে আসছে এতদিন। ওরা ভাবলো,
ভালুক অত্যাচারী ঠিকই, কিন্তু আমাদেরও কিছু
না কিছু ভুল আছে। এবার সব ভুল ভাঙার সময়
এসেছে। ভালুক ওকে ধরার জন্য আবার লাফ
দিল। কিন্তু লাফ দিয়ে আবার সরে গেলো।
ভালুকের এ আঘাতও ব্যর্থ হলো। এভাবে ভালুক আঘাত করতে থাকলো বারবার। কাঠবিড়ালির
বাচ্চা লাফিয়ে লাফিয়ে আঘাত
থেকে বাঁচতে থাকলো। এভাবে অনেক সময় শেষ
হয়ে যায়। ভালুক হাঁফাতে থাকে। এবার
কাঠবিড়ালির বাচ্চার সাহস
আরো বেড়ে গেলো। ‘নোংরা ভালুক, নোংরা ভালুক, কালো ভালুক,
কালো ভালুক’! কাঠবিড়ালির বাচ্চা এবার
ভালুকের
দিকে তাকিয়ে ওকে রাগাতে থাকে এসব
কথা বলে। এতে ভালুকের রাগের আগুন
আরো বাড়তে থাকে। সে আগের চেয়েও দ্রুতবেগে কাঠবিড়ালির বাচ্চার পিছু
নিতে থাকে। কাঠবিড়ালির
বাচ্চা দৌড়ে গিয়ে কাছের
একটি গাছে উঠলো। এবারও
জোরে জোরে বলতে লাগলো : ‘নোংরা ভালুক,
নোংরা ভালুক, কালো ভালুক, কালো ভালুক’। ভালুকও কাঠবিড়ালির বাচ্চার
পেছনে পেছনে গাছে উঠতে থাকে।
কাঠবিড়ালির বাচ্চা দেখলো ভালুকও
কাছাকাছি এসে গেছে, ও আরামের সাথে লাফ
দিয়ে উঁচু ডালে পৌঁছে যায়। আবার ও
বলতে লাগলো : ‘নোংরা ভালুক, নোংরা ভালুক, কালো ভালুক, কালো ভালুক’!
ভালুকের রাগের আর সীমা থাকলো না। কিন্তু
সে কাঠবিড়ালির বাচ্চার কিছুই
করতে পারছে না। কারণ, কাঠবিড়ালির
বাচ্চা তার নাগাল থেকে অনেক দূরে।
কাঠবিড়ালির বাচ্চা এভাবেই ভালুককে ক্ষেপানোর জন্য কথা বলতে থাকে।
আর ভালুক হাঁফাতে হাঁফাতে গাছের মাথায়
উঠে যায়। সেখান থেকে আবার অন্য গাছের
লাগানো ডাল বেয়ে অন্য গাছে চলে যায়। এত
হালকা ডালে ওঠার সাধ্য ভালুকের ছিলো না।
অন্য গাছের ডালে বসে কাঠবিড়ালির বাচ্চা নোংরা কালো ভালুককে উত্তেজিত
করতে থাকে। নোংরা,
কালো বলে বলে ভালুকের প্রতি ওর ঘৃণার
কথা জানাতে থাকে।
ভালুক ধীরে ধীরে গাছ থেকে নেমে আসে।
অন্য গাছের ওপর উঠে কাঠবিড়ালির বাচ্চার কাছে যেতে চেষ্টা করে। কাঠবিড়ালির
বাচ্চা বুঝলো, ভালুক ওর
কাছাকাছি এসে যাচ্ছে। আর কী! ও দিলো আর
এক লাফ। লাফিয়ে উঠে গেলো গাছের মাথার
ওপর। গাছের
মধ্যে একটি গর্তে চলে গেলো সে। সেখানে আরামের সাথে শুয়ে থাকলো। ভালুক গর্ত
পর্যন্ত পৌঁছে দেখলো, গর্তের মুখ এত ছোট, ও
না তার হাত তার মধ্যে প্রবেশ
করাতে পারছে, আর না তার
থুতনি দিয়ে ওকে ধরতে পারছে। এবার তার
অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকলো না। ও ভাবলো,
কখনো তো কাঠবিড়ালির বাচ্চাকে গর্ত
থেকে বের হতেই হবে। ও গর্ত থেকে বেরুলেই
ওর ঘাড় মটকে ধরে ফেলবে। কিন্তু
কাঠবিড়ালির বাচ্চা তো গর্তের
মধ্যে আরামে ঘুমুতে থাকে। এদিকে ভালুক ডালে বসে বসে ক্লান্ত হতে লাগলো। কিছুক্ষণ
পর ভালুকের শক্তি শেষ হয়ে গেল।
সে ধীরে ধীরে গাছ
থেকে নিচে নামতে থাকলো। কাঠবিড়ালির
বাচ্চা দেখলো ভালুক ক্লান্ত
হয়ে ফিরে যাচ্ছে। ও গর্ত থেকে বেরিয়ে এলো। একটি ডালে বসে ও
আবার ভালুককে রাগাতে থাকলো।
ভালুক এতো বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়লো যে, তার
পক্ষে আর কাঠবিড়ালির পিছু নেয়া কঠিন।
কিন্তু ও কোনোভাবেই পরাজয়
মানতে রাজি নয়। ও আবার ফিরে গেলো। ওর পাঞ্জা সেখানে মারলো যেখানে কাঠবিড়ালির
বাচ্চা বসে ছিলো। ততক্ষণে কাঠবিড়ালির
বাচ্চাও অন্য ডালে চলে গেলো লাফিয়ে।
কিন্তু ভালুকের পাঞ্জা গিয়ে পড়লো গাছের
একটি মধুর চাকে। আর কি, বোঝ এবার মজা!
মৌমাছিরা ভালুকের এ আচরণে ক্ষেপে গেলো। তাদের চাক নষ্ট হয়ে গেছে। ওদের কয়েক
মাসের জমানো সম্পদ ওর এক পাঞ্জায় শেষ
হয়ে গেছে। মৌমাছির সংখ্যা ছিলো হাজার
হাজার। ওরা সবাই
মিলে ঝাঁপিয়ে পড়লো ভালুকের সারা শরীরে।
ওর পশমের গোড়ায় গোড়ায় প্রবেশ করে হুল দিয়ে শরীরে দংশন করতে থাকে।
ততক্ষণে ওরা তার কান, চোখ এবং নাকের
মধ্যে চলে গেছে। শত শত, হাজার হাজার
বিষাক্ত হুল ওরা ভালুকের শরীরে প্রবেশ
করিয়ে দিল।
ব্যথার চোটে ভালুক চিৎকার করতে থাকে। এরই মধ্যে গাছের ডাল থেকে ফসকে পড়লো।
মুহূর্তেই সে ধপাস করে নিচে পড়ে গেলো।
গাছের নিচে ছিলো মস্ত বড় একটি পাথর।
ভালুকের মাথা গিয়ে পড়লো পাথরের ওপর।
তার মাথা গেলো ফেটে।
মাথা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরুতে থাকে। অন্য দিকে মৌমাছিগুলো ওকে দংশন করেই
যাচ্ছিলো। ভালুক
মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি খেতে লাগলো। ওর খুব
কষ্ট হচ্ছিলো। সে সময়ই ওর মনে হলো, ও ছোট
ছোট প্রাণীদের মারার সময়ও ওদের এমনই
কষ্ট হতো। ও মনে মনে শপথ করলো, আর কখনো কোনো প্রাণীকে জ্বালাতন করবে না।
ব্যথায় ভালুক বেহুঁশ হয়ে গেল। অনেকক্ষণ পর
ওর জ্ঞান ফিরলো। মাথার
রক্তগুলো এতক্ষণে জমাট বেঁধে গেছে।
মৌমাছিগুলোও তাদের রাগ
ঝেড়ে তাকে ছেড়ে চলে গেছে। ভালুক আস্তে আস্তে হেঁটে তার গুহার
দিকে চলে গেলো।
কিছুদিনের মধ্যে ভালুকটি সুস্থ হয়ে উঠলো।
সুস্থ হওয়ার পর সে আর কখনো ছোট দুর্বল
প্রাণীদের জ্বালাতন করেনি। এবার
তাকে বনের সবাই ভালো ভালুক বলতে থাকলো। সব প্রাণীই ওকে ভালোবাসতে থাকলো।
ওকে সম্মানও করে। ভালুক ওদের
সাথে খেলাধুলা করতে থাকে।
ওদেরকে সাহায্য করে আনন্দিত হতে থাকে।
কাঠবিড়ালি এবং ভালুকের যুদ্ধের
কথা পুরো বনে ছড়িয়ে পড়ে। সব বাচ্চাই কাঠবিড়ালির বাচ্চার বুদ্ধির
প্রশংসা করতে থাকে।
Read More...

√বোকা জ্যাকের কাণ্ড∆

Leave a Comment
জ্যাক শুধু বোকা নয়, ওরা ছিল ভারি গরিব।
গায়ে গতরে তাগড়া হলেও মায়ের
কোনো উপকারেই আসত না সে। দুটো খাবারের
জন্য মা রাতদিন খেটে মরলেও জ্যাক
ঘুরে বেড়াত গায়ে ফুঁ দিয়ে।
গরমকালে সে বাগানে বসে হাওয়া খেত। আর শীতকালে ঘরে বসে আরাম করত আগুনের
ওমে বসে। এক রোববার জ্যাককে মা ডেকে বললেন, ‘কাল
কাজে গিয়ে কিছু টাকাকড়ি জোগাড় করে আনো।
না হলে তোমাকে কিন্তু উপোস থাকতে হবে।’ জ্যাক বলল, ‘বেশ ভাল কথা। কিন্তু কোথায়
কাজে যাব সেটা বলে দাও।’ ‘মি. হোয়াইটের সঙ্গে দেখা করো।
উনি বাগানের কোনো কাজে লাগাতে পারেন
তোমাকে।’ সোমবার কাজে গেল জ্যাক। দিনের শেষে মি.
হোয়াইট দুটো পেনি দিলেন তাকে। এ
দিয়ে সে কী করবে ভেবে পেল না। কেননা এর
আগে সে এ জিনিস দেখেনি কখনও। পাথরের
টুকরোর মতো পেনি দুটো শূন্যে ছুড়ে মারল,
আবার ধরল, এমনি লোফালুুফি করতে করতে হারিয়ে গেল এক
সময়। বাড়ি ফিরে এলে মা জিজ্ঞেস করলেন,
‘কী টাকা কামাই করলে দেখি?’ জ্যাক ঝাটপট উত্তর দিল, ‘দুঃখিত, আমার
কাছে কোনো টাকা নেই। মি. হোয়াইট
দুটো পেনি দিয়েছিল, কিন্তু
তা পথে পড়ে গেছে কোথাও।’ ‘তুমি সেটা পকেটে রাখোনি কেন?’ মার
চোখে মুখে বিস্ময়! ‘এরপর থেকে রাখব।’ মঙ্গলবার পুনরায় কাজে বেরোল জ্যাক। এবার
সে কাজ পেল মাঠে গরু চরানোর।
বেলা শেষে ফিরে এলে মালিক
তাকে টাকা না দিয়ে কিছু দুধ দিল
মজুরি বাবদ। আগের ভুলের
কথা চিন্তা করে সে দুধের বাটিটা কোটের পকেটে ঢুকিয়ে দৌড়ে চলে এল বাড়িতে। জ্যাক যখন বাড়িতে ফিরল তখন এক
ফোঁটা দুধও অবশিষ্ট ছিল না। মা চোখ কুঁচকে বললেন, ‘এভাবে দুধ কেউ
পকেটে করে আনে বোকা ছেলে!
তুমি এটা মাথায় করে আনোনি কেন?’
জ্যাকের সোজা উত্তর, ‘আর ভুল হবে না মা।
পরেরবার ঠিকঠাকভাবে আনব তোমার
কথা মতো।’ বুধবার জ্যাক আবার গিয়ে হাজির
হলো কিষাণের বাড়িতে। দুধ দিয়ে মাখন
বানানোর কাজে সে সাহায্য করল লোকটাকে।
কাজ শেষ হলে টাকাকড়ির বদলে বেশ কিছু
মাখন দেয়া হলো জ্যাককে। মায়ের কথামতো জ্যাক এবার মাখনের বড়
টুকরোটা তুলে নিল মাথায়। সময়টা ছিল
গরমকাল। রোদের তেজে জ্যাকের মাথাও ছিল
গরম। যার ফলে একটু পরই মাখন চুঁেয়
লেপ্টে গেল সারামুখে। জ্যাক যখন বাড়ি ফিরল তখন আর এক
ফোঁটা মাখন অবশিষ্ট ছিল না।
মা রেগেমেগে বললেন, ‘এভাবে কেউ মাখন
মাথায় বয়ে আনে?
তুমি এটা হাতে আনোনি কেন?’। ‘পরের বার আর ভুল হবে মা।’ বৃহস্পতিবার জ্যাক পুনরায় কাজে গেল মি:
হোয়াইটের বাড়িতে। লোকটা আজ
দুটো পেনি না দিয়ে একটা ছোট্ট কুকুর
গছিয়ে দিলেন জ্যাককে। মায়ের নির্দেশ মনে পড়ে গেল জ্যাকের।
এবার সে কুকুরটাকে পকেটে পুরল না। মাথায়ও
তুলে নিল না মাখনের মতো।
বরং কাগজে মুড়ে হাতে নিয়ে রওনা হলো বাড়ির
উদ্দেশ্যে।
মা ছেলের বোকামিতে ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, ‘ওরে হাবা,
ওভাবে কুকুরটাকে না এনে কোমরের বেল্ট
পেঁচিয়ে আনলেই তো ল্যাটা চুকে যেত।’ ‘পরেরবার তোমার কথার আর নড়চড়
হবে না মা।’ শুক্রবার সে কাজে গেল আবার। এবার কাজ
নিল এক দোকানে। কাজ শেষে তাকে বড়
একটা পনিরের টুকরো দিল দোকানদার। মায়ের কথা মনে পড়ল জ্যাকের। আগের
মতো ভুল না করে সে পনিরের
টুকরোটা ঝুলিয়ে নিল বেল্টের সঙ্গে।
যেতে যেতে গলতে শুরু করল পনির। এবং যখন
শেষমেশ সে বাড়িতে পৌঁছুল ততক্ষণে ময়লা-
আবর্জনা মেখে সেটা একেবারে খাবার অযোগ্য হয়ে পড়ল। মা বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘হায়রে বোকা ছেলে,
ওটা তুমি পিঠে বয়ে আনোনি কেন?’ ‘আর কখনও ভুল হবে না মা।’ শনিবার আবার জ্যাক কাজ করতে গেল সেই
খামারে। কাজ শেষ হওয়ার পর চাষি বলল,
‘তোমার মা পিঠে করে কাঠ নিয়ে যান
শহরে বেচতে। এটা খুবই কষ্টের ব্যাপার।
আমি তাকে একটা তাজা ঘোড়া দিচ্ছি।
তাকে বলবে, এটা আমার পক্ষ থেকে উপহার, বুঝেছ।’ ‘অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। এটা পেয়ে নিশ্চয়
খুশি হবেন মা।’ মায়ের শেষ কথাটা মনে গেঁথে ছিল জ্যাকের।
তার শরীর-স্বাস্থ্য তাগড়া হলেও
ঘোড়াটা পিঠে তোলা ছিল সত্যি কঠিন। বার
বার চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত
ওটা পিঠে তুলে রওনা হল বাড়ির দিকে। ওই গ্রামে ছিল মস্ত এক ধনী লোক।
ধনী হলে কী হবে, সুখ ছিল না লোকটার মনে।
তার ফুটফুটে মেয়েটি কথা বলতে পারে না,
কানেও শোনে না। তিনি এ নিয়ে বন্ধুদের
কাছে দুঃখ করে বলতেন, ‘আমার টাকা-
পয়সা কী কাজে আসবে যদি না মেয়েটা কথা বলতে পারে!’ এই শুনে তার এক চতুর ডাক্তার বন্ধু
পরামর্শের গলায় বললেন, ‘একটা উপায়
আছে যা তোমার মেয়ের উপকারে আসতে পারে।
যে করে হোক ওকে হাসাতে হবে।
হাসতে পারলেই হাসি ফুটবে ওর মুখে।’ সবাই মিলে শত চেষ্টা করেও হাসাতে পারল
না মেয়েটাকে। একদিন বাবার
সঙ্গে বাগানে বেড়াতে গিয়ে হঠাৎ
সে একটা মজার জিনিস দেখতে পেল।
সাধারণত ঘোড়ার পিঠে মানুষ চড়লেও এই
ব্যাপারটা ছিল পুরো উল্টো।
এখানে ঘোড়াটাই দিব্যি ঠ্যাং উঁচিয়ে শুয়ে আছে ছেলেটার
পিঠে।
ঘোড়াটাকে এভাবে পিঠে বয়ে নিয়ে যেতে দেখে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল
মেয়েটা। হাসি আর কিছুতেই থামে না। একটু
দম নিয়ে চেঁচিয়ে বলল, ‘বাবা দেখ অই
ছেলেটা পিঠে করে ঘোড়া নিয়ে যাচ্ছে!’ ‘ওহ: মাগো, তুমি কথা বলতে পারছ!
কী যে খুশি লাগছে আমার।’
বাবা আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন। রাস্তার
কাছে এগিয়ে তিনি ছেলেটাকে ডেকে বললেন,
‘এই যে বাপু, কী নাম তোমার? ‘জ্যাক।’ হ্যঁ, এটা ছিল বোকা জ্যাকের কাণ্ড। কিন্তু
তাকে এখন আর বোকা বলা যাবে না।
কেননা সেদিন থেকেই তার শুরু হলো নতুন
পরিবর্তনের পালা। ধনী লোকটা প্রচুর
টাকা আর মালামাল উপহার দিল তাকে। জ্যাক
নিয়মিত সাহায্য করত মাকে। এবং রোজ কাজে বেরোত ধনী লোকটার বাড়িতে। যখন
সে পূর্ণ যুবক হলো তখন সেই-বাড়ির
সুন্দরী মেয়েটিকে বিয়ে করে সুখে দিন
কাটাতে লাগল।
Read More...